নজরবন্দি ব্যুরো: নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও হড়পা বানের পর উদ্ধারকাজে বিদেশি দল পাঠানোর প্রস্তাব একের পর এক ফিরিয়ে দিল কাঠমান্ডু। ভারত, চিন, আমেরিকা, ব্রিটেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ—এই আট দেশই উদ্ধারকারী দল পাঠানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের (Balendra Shah) সরকার জানিয়েছে, আপাতত নেপালের সেনা, পুলিশ ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ সংস্থাই উদ্ধারকাজ সামলাতে সক্ষম।
নেপালের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী (Lok Bahadur Chhetri) জানিয়েছেন, বিদেশি সাহায্যের প্রস্তাব আসা স্বাভাবিক। তবে এই মুহূর্তে বাইরের উদ্ধারকারী দলের প্রয়োজন নেই বলেই সরকারের সিদ্ধান্ত। ভয়াবহ বিপর্যয়ে শত শত মানুষ এখনও নিখোঁজ, তাঁদের মধ্যে বহু বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। তবু উদ্ধারকাজে বিদেশি দলকে অনুমতি দেয়নি কাঠমান্ডু।
নেপালের এই সিদ্ধান্তের পিছনে ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন এক সরকারি আধিকারিক। সে বার বিপুল সংখ্যক বিদেশি উদ্ধারকারী দল ও সংস্থা নেপালে পৌঁছেছিল। বিভিন্ন দলের মধ্যে সমন্বয়, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং তাঁদের কোথায় কীভাবে মোতায়েন করা হবে—তা নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার একটি স্পষ্ট নেপালি কমান্ড কাঠামোর মধ্যে উদ্ধারকাজ চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকেও ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স (National Disaster Response Force) পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাবও গ্রহণ করেনি নেপাল। অন্যদিকে, ভারত ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত নেপালের জন্য ৪৭.৫ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্থায়ী আশ্রয়ের সরঞ্জাম, কম্বল, ওষুধ, খাবার, হাইজিন কিট এবং অন্যান্য জরুরি সামগ্রী।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) বুধবার নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে কথা বলে বিপর্যয়ে সমবেদনা জানান এবং সম্ভাব্য সব ধরনের সাহায্যের আশ্বাস দেন। ভারতীয় বায়ুসেনার C-17 ও C-130J বিমানেও ত্রাণ পৌঁছেছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করতে Bailey bridge এবং prefabricated truss bridge দেওয়ার প্রস্তাবও জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
বিদেশি উদ্ধারকারী দলকে না বললেও বিদেশি ত্রাণ ও অর্থসাহায্য প্রত্যাখ্যান করছে না নেপাল। বরং কাঠমান্ডু জানিয়েছে, বিদেশ থেকে আসা আর্থিক সাহায্য একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানো হোক। পরবর্তী সময়ে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইতিমধ্যেই আমেরিকা, ব্রিটেন ও বিশ্ব ব্যাঙ্ক নেপালকে আর্থিক সহায়তার কথা জানিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়াও মানবিক সহায়তা হিসেবে ১০ লক্ষ ডলার দেওয়ার ঘোষণা করেছে। তবে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রশ্নে সিওল এখনও নেপালের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার নয় জন নাগরিক নিখোঁজ এবং আরও ১০ জন আটকে রয়েছেন বলে দেশটির বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে।
এদিকে বিপর্যয়ের ভয়াবহতা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ২৮ আগস্টের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, নেপালে মৃতের সংখ্যা ৪৬৯-এ পৌঁছেছে এবং আরও প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ। নেপাল-চিন সীমান্তের রসুয়া (Rasuwa) অঞ্চলে ভয়াবহ হড়পা বান ও ধসের জেরে রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র-সহ বিস্তীর্ণ পরিকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।
এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয় ২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস থেকে। তার জেরে নদীপথে নেমে আসে বিপুল পরিমাণ জল, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে একটি barrier lake তৈরি হওয়ার পর; সেটি উপচে পড়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে এবং কিছু এলাকায় উদ্ধারকাজ সাময়িক ভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বিদেশি উদ্ধারকারী দল না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও নেপালের বিদেশ মন্ত্রক স্পষ্ট করেছে, এর সঙ্গে চিন সীমান্তবর্তী রসুয়া অঞ্চলের কৌশলগত সংবেদনশীলতার কোনও সম্পর্ক নেই। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, নিজেদের নিরাপত্তা বাহিনীই উদ্ধারকাজ চালানোর মতো সক্ষম এবং আপাতত সেই ব্যবস্থাতেই আস্থা রাখছে কাঠমান্ডু। ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে এখন নেপালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিখোঁজদের সন্ধান, আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে আনা এবং নতুন করে বন্যার ঝুঁকি সামলে উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালিয়ে যাওয়া।



