নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের (Flash Flood) পরিস্থিতি ক্রমশ আরও ভয়াবহ হচ্ছে। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪৭-এ পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে নেপালের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি। নিখোঁজ রয়েছেন ৯৭৭ জন। অন্যদিকে চিনের সরকারি নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের দাবি, মৃতের সংখ্যা ৫৫২। নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে এখনও দেড় হাজারেরও বেশি মানুষের কোনও খোঁজ নেই বলে জানা গিয়েছে।
বিপর্যয়ের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তিব্বতকে ঘিরে। তিব্বতের দিকে একটি বাঁধ ভেঙে পড়ায় নেপাল পুলিশ সতর্কতা জারি করেছে। ফলে ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত এলাকাগুলিতে নতুন করে জলস্ফীতি বা বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলিকে পরিস্থিতির উপর নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নেপালের ভয়াবহ বন্যায় আটকে পড়া ভারতীয়দের সংখ্যা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। শুক্রবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, নেপালে থাকা ৩১৫ জন ভারতীয়ের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে কিছুটা স্বস্তির খবরও রয়েছে। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮৫ জন ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এছাড়াও নেপালে আটকে পড়া ২১ জন পুণ্যার্থীর একটি দলকে নিরাপদে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। নেপাল সেনার উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে তাঁদের দেশে ফেরানো সম্ভব হয়েছে। ফলে নিখোঁজ ভারতীয়দের উদ্ধারে ভারত ও নেপাল প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো হচ্ছে।
বিপর্যয়ের জেরে নেপালের একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশ কয়েকটি প্রকল্পের টানেল ধসে পড়ায় সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের আটকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে টানেল উদ্ধারে বিশেষজ্ঞ একটি দল নেপালে পাঠাচ্ছে ভারত।
শুধু বিশেষজ্ঞ দলই নয়, ভারতের তরফে নেপালের জন্য বেইলি ব্রিজ এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত ত্রাণসামগ্রীও পাঠানো হচ্ছে। বিপর্যস্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং আহতদের চিকিৎসায় এই সরঞ্জাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S. Jaishankar) জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে ভারতের প্রধান অগ্রাধিকার হল নেপালের উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করা এবং সেখানে আটকে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা। সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজনীয় সহায়তা পাঠানোর কাজ চলছে।
ভয়াবহ এই হড়পা বানের কারণ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে (United States Geological Survey) জানিয়েছে, হিমবাহ ধসের সঙ্গে এই বিপর্যয়ের যোগ রয়েছে। আচমকা বিপুল পরিমাণ জল নেমে আসায় নদীগুলিতে জলস্তর দ্রুত বেড়ে যায় এবং তার জেরেই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে।
ক্ষয়ক্ষতির যে ছবি সামনে আসছে, তাতে ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর নেপালে এমন বড় বিপর্যয় দেখা যায়নি বলেই মনে করা হচ্ছে। বিস্তীর্ণ এলাকায় রাস্তা, সেতু, বসতি এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উদ্ধারকাজে নেপালের ১৪ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন রয়েছেন। সংবাদমাধ্যম সূত্রে এখনও পর্যন্ত ৩,৭৪২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও নিখোঁজ থাকায় উদ্ধারকারী দলগুলির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ধ্বংসস্তূপ ও দুর্গম এলাকায় পৌঁছনো।
মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, নিখোঁজের তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে। তার উপর তিব্বতের বাঁধ ভেঙে নতুন করে জলস্ফীতির আশঙ্কা এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারের চাপ—সব মিলিয়ে নেপালের পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত সংকটজনক। এই অবস্থায় ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দুর্গত নেপালকে দ্রুত সহায়তা করাই নয়াদিল্লির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।



