তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (TMCP) প্রতিষ্ঠা দিবস ঘিরে দুই তৃণমূল শিবিরের টানাপোড়েন এবার গড়াল কলকাতা হাই কোর্টে (Calcutta High Court)। ২৮ অগস্টের কর্মসূচির জন্য মেয়ো রোডে সভা করার অনুমতি চেয়েছিল কালীঘাটপন্থী ও ঋতব্রতপন্থী—দুই শিবিরই। মঙ্গলবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের (Justice Saugata Bhattacharya) বেঞ্চ অবশ্য কাউকেই মেয়ো রোডে সভার অনুমতি দেয়নি। পরিবর্তে দুই পক্ষকেই পৃথক জায়গায় কর্মসূচি করার সুযোগ দিয়েছে আদালত।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, কালীঘাটপন্থী শিবির ক্যাথিড্রাল রোডে এবং ঋতব্রতপন্থী শিবির রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে কর্মসূচি করতে পারবে। দুই অনুষ্ঠানই হবে নির্দিষ্ট শর্ত মেনে। আদালতের মূল লক্ষ্য, দুই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যাতে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা বা শহরের যান চলাচলে কোনও বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটে।
দুই শিবিরের কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ ১,৫০০ জন করে জমায়েত করা যাবে বলে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। অর্থাৎ, প্রাথমিক ভাবে যে প্রায় ১০ হাজার মানুষের জমায়েতের পরিকল্পনা ছিল, তার তুলনায় অনুমোদিত সংখ্যা অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুই পক্ষকেই দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে কর্মসূচি শেষ করতে হবে বলে আদালত নির্দেশ দিয়েছে।
শুধু জমায়েতের সংখ্যা নয়, নিরাপত্তা ও যান নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। দুই শিবিরকে ২০ জন করে স্বেচ্ছাসেবকের নাম ও ফোন নম্বর পুলিশকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠান চলাকালীন যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্বও আয়োজকদের নিতে হবে। পাশাপাশি কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
শুনানির সময় দুই পক্ষকে একসঙ্গে অনুষ্ঠান করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখেছিল আদালত। তবে শেষ পর্যন্ত দুই শিবিরের মধ্যে যৌথ কর্মসূচি নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়নি। সেই পরিস্থিতিতে পৃথক ভাবে অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেওয়া হলেও মেয়ো রোডের ঐতিহ্যবাহী জায়গাটি কোনও পক্ষকেই দেওয়া হয়নি।
প্রতি বছর ২৮ অগস্ট তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস পালনের মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে মেয়ো রোডের গান্ধী মূর্তির পাদদেশ। তৃণমূলের অখণ্ড সময়ে সেখানে বড় সমাবেশে উপস্থিত থাকতেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। কিন্তু ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাওয়ায় এ বার সেই ঐতিহ্যবাহী কর্মসূচিই দুই শিবিরের শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
মেয়ো রোড নিয়ে এই সংঘাত অবশ্য নতুন নয়। ২১ জুলাই শহিদ দিবস পালন নিয়েও দুই শিবিরের মধ্যে পৃথক কর্মসূচি ঘিরে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। সেই সময়ও আদালত দুই পক্ষের কর্মসূচির জন্য আলাদা ব্যবস্থা করেছিল এবং জমায়েত ও স্থান নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। ফলে টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবসেও আদালত সংঘাত এড়াতে একই ধরনের ভারসাম্যের পথ নিল বলে মনে করা হচ্ছে।
এই রায়ের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। একই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা দিবস, অথচ দুই শিবিরের জন্য আলাদা মঞ্চ—তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ছবিটাই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ঐতিহ্যবাহী মেয়ো রোডে কোনও পক্ষকেই একক ভাবে কর্মসূচির সুযোগ না দিয়ে আদালত কার্যত সংঘাতের সম্ভাবনাকে দূরে রাখার পথ বেছে নিয়েছে।
ফলে আগামী ২৮ অগস্ট কলকাতায় একই দিনে টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবস পালিত হলেও দুই শিবিরের কর্মসূচি হবে দুই পৃথক জায়গায়। মেয়ো রোডে কাউকেই নয়—আদালতের এই সিদ্ধান্তে একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনই দুই পক্ষকেই নিজেদের কর্মসূচি করার সুযোগও দেওয়া হয়েছে।



