বাংলায় বিজেপি সরকারের ১০০ দিন পূর্তির মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাজের খতিয়ান নিয়ে বড় দাবি করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। শুক্রবার শিলিগুড়িতে এসে শাহ জানান, ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রায় ৪৩ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। একইসঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দ্রুততার উদাহরণ দিতে গিয়ে প্রকাশ্যেই শুভেন্দুর প্রশংসা করেন তিনি।
শিলিগুড়িতে কেন্দ্রীয় বাহিনী সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অমিত শাহ বলেন, “শুভেন্দুজির প্রশংসা করতে চাই।” তাঁর দাবি, সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে রাজ্য সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন হলে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বললেই দ্রুত অনুমোদন পাওয়া যায়। তাঁর কথায়, চিঠি পৌঁছনোর আগেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হয়ে যায়।
শাহের বক্তব্যে উঠে আসে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয়ের একটি নির্দিষ্ট ছবিও। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে যে জমি চাওয়া হচ্ছিল, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে তার ১,১২৯ একর বিএসএফ (BSF) ও এসএসবি (SSB)-র জন্য দেওয়া হয়েছে। আরও ২৯ একর জমি তখনও বাকি ছিল বলে জানান তিনি।
সেই বাকি জমির বিষয়টিও এদিন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় তুলেছেন বলে জানান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শাহের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ২৯ একর জমির অর্থপ্রদানের বিষয়টি মিটলেই দ্রুত অনুমোদনের আশ্বাস দিয়েছেন শুভেন্দু।
শুধু জমি হস্তান্তর নয়, রাজ্যের প্রশাসনিক তৎপরতাকেও নিজের বক্তব্যে তুলে ধরেন শাহ। তাঁর দাবি, বিজেপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলির বাস্তবায়নে দ্রুত এগোচ্ছে। সেই কাজেরই হিসেব দিতে গিয়ে ১০০ দিনের মধ্যে ৪৩ শতাংশ প্রতিশ্রুতি পূরণের কথা বলেন তিনি।
তবে অমিত শাহের এই ‘৪৩ শতাংশ’ হিসেবের ভিত্তি কী—কোন প্রতিশ্রুতির কত শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, তার বিস্তারিত তালিকা বা পৃথক পরিসংখ্যান এদিনের বক্তব্যে প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে সংখ্যাটি মূলত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবেই সামনে এসেছে।
এদিন উত্তরবঙ্গে পৌঁছেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন শাহ। মে ফেয়ার হোটেলে রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি-সহ সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা।
বৈঠকের আলোচনায় ছিল রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা। পাশাপাশি সম্প্রতি গঠিত অ্যান্টি-নারকটিকস টাস্ক ফোর্স (Anti-Narcotics Task Force) ও এটিএস (ATS)-এর কাজকর্ম নিয়েও পর্যালোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এই বৈঠকেই বিজেপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে রাজ্য পুলিশ কী কী পদক্ষেপ করেছে, তার বিস্তারিত তথ্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হয়। অর্থাৎ শুভেন্দু সরকারের প্রথম ১০০ দিনের প্রশাসনিক রিপোর্ট কার্ডের একটি বড় অংশই এদিনের আলোচনায় আইনশৃঙ্খলা, সীমান্ত ও পুলিশি পরিকাঠামোকে ঘিরে ছিল।
রাজনৈতিক দিক থেকে অমিত শাহের মন্তব্য অবশ্য আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। বাংলায় বিজেপির প্রথম সরকার ক্ষমতায় আসার ১০০ দিনের মাথায় মুখ্যমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে প্রশংসা করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বার্তা কার্যত রাজ্য সরকারের কাজের পক্ষে কেন্দ্রের শীর্ষ নেতৃত্বের সার্টিফিকেট হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তার মতো কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় নির্ভর বিষয়ে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং দ্রুত সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরে শাহ বোঝাতে চেয়েছেন, নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির সমন্বয়ে কোনও জটিলতা নেই। বরং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার দ্রুত সহযোগিতা করছে—এটাই তাঁর বক্তব্যের মূল সুর।
এখন দেখার, ১০০ দিনে ৪৩ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার এই দাবি আগামী দিনে কীভাবে বিস্তারিত সরকারি হিসেবের সঙ্গে মেলে। কারণ ভোটের প্রতিশ্রুতি পূরণের আসল মূল্যায়ন হবে শুধু শতাংশের অঙ্কে নয়, সেই প্রতিশ্রুতির কতগুলি বাস্তবে মানুষের জীবনে পৌঁছেছে, তার ভিত্তিতেই। আপাতত অমিত শাহের ‘৪৩ শতাংশ’ এবং “শুভেন্দুজির প্রশংসা করতে চাই” মন্তব্য ঘিরেই বাংলার রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।



