ভারতীয় সিনেমার প্রতিবাদী মুখ মৃণাল সেন, যিনি বদলে দিয়েছিলেন চলচ্চিত্রের ভাষা

ভারতীয় সমান্তরাল সিনেমার অন্যতম পথিকৃৎ মৃণাল সেন সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের বাস্তব জীবনকে নতুন ভাষায় তুলে বদলে দিয়েছিলেন চলচ্চিত্রের ধারা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক
ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে যে ক’জন নির্মাতা শুধুমাত্র চলচ্চিত্র বানাননি, বরং সময়, সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পর্দায় নতুন ভাষা দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম মৃণাল সেন। বাংলা সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় সমান্তরাল ধারার সিনেমার এক আন্তর্জাতিক মুখ। তাঁর ছবি শুধু বিনোদনের জন্য নয়, দর্শককে ভাবাতে, প্রশ্ন তুলতে এবং সমাজের আয়না সামনে ধরতেই তৈরি হত।

১৯২৩ সালে বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম মৃণাল সেনের। দেশভাগ, রাজনৈতিক টানাপড়েন, দুর্ভিক্ষ, মধ্যবিত্তের সংকট— এই সমস্ত অভিজ্ঞতা তাঁর ভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কলকাতায় পড়াশোনা করতে এসে তিনি ঘনিষ্ঠ হন বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে। যদিও তিনি কখনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রচারের মুখ হয়ে ওঠেননি, তবু তাঁর সিনেমায় সাধারণ মানুষের লড়াই, অসাম্য এবং রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্ন সবসময়ই স্পষ্ট ছিল।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভারতীয় সিনেমা যখন মূলত গান-নাচ ও বাণিজ্যিক ফর্মুলার উপর নির্ভরশীল, তখন মৃণাল সেন অন্য পথ বেছে নেন। তাঁর প্রথম দিকের ছবি ‘নীল আকাশের নীচে’ কিংবা ‘ভুবন সোম’ ভারতীয় সিনেমায় নতুন ভাষা নিয়ে আসে। বিশেষ করে ১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ভুবন সোম’কে ভারতীয় নিউ ওয়েভ সিনেমার অন্যতম সূচনা হিসেবে ধরা হয়। খুব কম বাজেটে তৈরি এই ছবি দেখিয়ে দিয়েছিল, বড় তারকা বা বিশাল সেট ছাড়াও শক্তিশালী গল্প ও নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে দর্শকের মন জয় করা সম্ভব।

সত্তরের দশকে কলকাতার রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুবসমাজের হতাশা তাঁর ছবিতে বিশেষভাবে উঠে আসে। ‘ইন্টারভিউ’, ‘কলকাতা ৭১’, ‘পদাতিক’— এই ছবিগুলো শুধুই সিনেমা নয়, বরং সময়ের দলিল। শহরের মধ্যবিত্ত যুবকের ক্ষোভ, বেকারত্ব, নকশাল আন্দোলনের অভিঘাত— সবকিছুকে তিনি পর্দায় তুলে ধরেছিলেন নির্ভীকভাবে। তাঁর সিনেমা কখনও সহজ উত্তর দেয়নি, বরং প্রশ্ন তুলেছে বারবার।

মৃণাল সেনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর পরীক্ষাধর্মী ভাষা। তিনি প্রচলিত গল্প বলার ধরন ভেঙে সিনেমাকে আরও বাস্তব ও রাজনৈতিক করে তুলেছিলেন। কখনও ডকুমেন্টারি স্টাইল, কখনও সরাসরি ক্যামেরার সঙ্গে চরিত্রের কথা বলা— তাঁর নির্মাণশৈলী ভারতীয় সিনেমায় একেবারেই আলাদা ছিল। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও তাঁর ছবির ব্যাপক প্রশংসা হয়। কান, বার্লিন, মস্কো— বিশ্বের বিভিন্ন মঞ্চে সম্মানিত হয়েছেন তিনি।

তবে মৃণাল সেন শুধুই রাজনৈতিক পরিচালক ছিলেন না। মানুষের সম্পর্ক, একাকীত্ব, অপরাধবোধ, সময়ের পরিবর্তন— এই বিষয়গুলিও তাঁর ছবিতে সমান গুরুত্ব পেয়েছে। ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘খারিজ’, ‘আকালের সন্ধানে’ কিংবা ‘আমার ভুবন’-এর মতো ছবিতে তিনি মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্বকে অসাধারণ সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেছেন।

আজকের ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়েও মৃণাল সেন প্রাসঙ্গিক। কারণ তাঁর সিনেমা আমাদের শিখিয়ে দেয়, চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়, সমাজকে দেখার এক শক্তিশালী মাধ্যম। তিনি দেখিয়েছিলেন, ক্যামেরা শুধু গল্প বলে না, প্রতিবাদও করতে পারে। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে তাই মৃণাল সেন শুধুমাত্র একজন পরিচালক নন, তিনি এক যুগের বিবেক।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন