গরু পাচার কাণ্ডে নির্বাচনের গন্ধ! CBI-স্ক্যানারে রাজ্যের ১৪ রাঘব বোয়াল।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরোঃ গরু পাচার কাণ্ডে নির্বাচনের গন্ধ! CBI-টার্গেটে রাজ্যের রাঘব বোয়ালরা। সামনেই ভোট। প্রচারের তোরজোড়ও তাই তুঙ্গে । বরাবরের মত শাসক দল ও বিরোধী পক্ষও নেমে পড়েছে মাঠে । লড়াই চলছে সমানে সমানে। গতকালই খোদ দিলীপ ঘোষের গড় থেকে বিজেপির ৫০ জন নেতা যোগ দিয়েছেন শাসক দলে । কিন্তু তাতে কিছু এসে যায়না বলেই জানিয়েছিলেন বিরোধী পক্ষের বিজেপি নেতা,দিলীপ ঘোষ । তবে কেন একথা বললেন তিনি, তার আঁচ মিলেছে গরু পাচার চক্রের হদিশ মিলতেই।

আরও পড়ুনঃ কত বয়েস? দেখে নিন রাজ্যের করোনা আবহে আপনার রিস্ক গ্রাফ!

সিবিআই তদন্তে এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত বিএসএফের কমান্ডান্ট পদমর্যাদার আধিকারিক, সতীশ কুমারের নামে এফআইআর করা হয়েছে। সিবিআই আধিকারিকদের ইঙ্গিত, বিএসএফ এবং কাস্টমসের পাশাপাশি, এ রাজ্যের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিরও নাম উঠে এসেছে প্রাথমিক অনুসন্ধানে। ওই প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও বিএসএফ এবং কাস্টমসের আধিকারিকদের মতোই লাভবান হয়েছেন গরু পাচারের সিন্ডিকেট থেকে। ভোটের আগে সিবিআইের এহেন ইঙ্গিতে ভীত এখন সেইসব রাঘববোয়ালরা।

গরু পাচার কাণ্ডে নির্বাচনের গন্ধ! CBI-টার্গেটে রাজ্যের রাঘব বোয়ালরা। গতকাল গরু পাচারচক্রের হদিশ পেতে বুধবার কলকাতা, সল্টলেক, রাজারহাট, মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং ভিন্ন রাজ্যে সব মিলিয়ে ১৩টি জায়গায় তল্লাশি করে সিবিআই। এছাড়াও অমৃতসর, গাজিয়াবাদ এবং রায়পুরে তল্লাশি চালান সিবিআইয়ের আধিকারিকরা। সতীশের সল্টেকের বাড়িতে তল্লাশি চলে। পরে এ দিন সন্ধ্যায় ওই বাড়ি সিল করে দিয়েছে সিবিআই। সতীশ বর্তমানে ছত্তীসগঢ়ের রায়পুরে কর্মরত। সেখানেও তল্লাশি চালান গোয়েন্দারা। সিবিআই হানা দেয় তাঁর গাজিয়াবাদের বাড়িতেও।

এ ছাড়া, মুর্শিদাবাদের কুলগাছিয়াতে অভিযুক্ত এনামুলের গ্রামে তাঁর সিন্ডিকেটের দুই শাগরেদ গোলাম মোস্তাফা এবং আনারুল শেখের বাড়িতেও তল্লাশি চালান গোয়েন্দারা। গরুকে বাছুর বানিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও কেন্দ্রীয় শুল্ক দফতর -এর ‘বেনামী’ রোজগার হয় কোটি কোটি টাকা। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে গবাদি পশু পাচারের তদন্তে নেমে এমনটাই জানতে পেরেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই। পাচারের এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বিএসএফ, কাস্টমস-সহ বিভিন্ন দফতরের একাধিক সরকারি আধিকারিক।

তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে এ রাজ্যে গরু পাচার নিয়ে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে সিবিআই। এফআইআরে মূল অভিযুক্তদের অন্যতম সতীশ কুমার। বিএসএফের কমান্ডান্ট পদমর্যাদার আধিকারিক। সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৫-র ডিসেম্বর থেকে ২০১৭-র এপ্রিল সতীশ কুমার এ রাজ্যে বিএসএফের ৩৬ নম্বর ব্যাটালিয়নের কমান্ডান্ট ছিলেন। ওইসময় তাঁর বাহিনী মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় বাংলাদেশ সীমান্তে বাজেয়াপ্ত করেছিল প্রায় ২০ হাজার গরু। কিন্তু বাজেয়াপ্ত করা সেই গরুকেই বিএসএফের সরকারি খাতায় বাছুর বলে নথিভুক্ত করা হয় ।

এর পর গরুর যা দাম, তার অনেক কম দামে সেই ‘বাছুর’ নিলাম হত স্থানীয় বাজারে। আর নিলামে সেই গরু ফের কম দামে কিনে নিত মুর্শিদাবাদের পাচারকারীরা। জানা যায় বিশু শেখ সেই চক্রের মাথা। অন্যদিকে নিলামে কিনে নেওয়া ওই গরুই ফের সীমান্ত পেরিয়ে পাচার হয়ে যেত বাংলাদেশে। আর বিএসএফ যে গরুকে ‘বাছুর’ বানিয়ে দিল, তার ‘মূল্য’ হাতেগরমে দিত বিশু শেখের সিন্ডিকেট। বিএসএফের জন্য বরাদ্দ থাকত গরু প্রতি ২ হাজার টাকা। আর ৫০০ টাকা কাস্টমসের জন্য। তথ্য ফাঁস হতেই মঙ্গলবার সিবিআইয়ের কলকাতার ডিআইজি অখিলেশ কুমার সিংহ একটি এফআইআর (আরসি ১০২০২০এ০০১৯) দায়ের করেন। সিবিআইয়ের করা ওই এফআইআরে অভিযুক্ত করা হয়েছে এই সতীশ কুমারকে।

সিবিআইয়ের দুর্নীতি দমন শাখার করা ওই এফআইআরে সতীশ একা নন, তাঁর ছেলে, গরু পাচার চক্রের মাথা বিশু শেখ ওরফে মুর্শিদাবাদের ডাকসাইটে ব্যবসায়ী এনামুল হক, তাঁর সঙ্গী আনারুল শেখ ও গোলাম মোস্তাফা-সহ অজ্ঞাত পরিচয়ের একাধিক সরকারি কর্মী এবং অন্যদের নাম রয়েছে। সিবিআইয়ের অভিযোগ, গরু পাচারকারী সিন্ডিকেটের কাছ থেকে সতীশ নিজে তো লাভবান হয়েছেন, সেই সঙ্গে আর্থিক মুনাফা পেয়েছেন তাঁর ছেলে ভুবন ভাস্করও। সিবিআইয়ের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, সতীশের ছেলে ভুবন ভাস্কর এনামুলের কোম্পানি ‘মেসার্স হক ইন্ডাস্ট্রি’তে চাকরি করেছেন বেশ কিছু দিন। সেখান থেকে তিনি মাসে ৪০ হাজার টাকা বেতনও পেতেন। তদন্তকারীদের দাবি, এটাও ঘুরিয়ে গরু পাচারে সুবিধে করে দেওয়া বাবদ বেআইনি রোজগার।

তবে শুধু পাচারে সহায়তা নয়, বাজেয়াপ্ত গরুকে খাতায়কলমে বাছুর হিসাবে দেখিয়েও সরকারকে প্রতারণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ সিবিআইয়ের। সুবিধে পাইয়ে দেওয়া হয়েছে পাচারকারীদের। সিবিআইয়ের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘পাচার সিন্ডিকেটের সঙ্গে আঁতাঁত করেই নির্দিষ্ট সময় অন্তর কিছু কিছু গবাদি পশু বাজেয়াপ্ত করা হত। আর তার দামও কিছু কম পেত না।” CBI গোয়েন্দাদের দাবি, শুধু বিএসএফ কম্যান্ডার সতীশ কুমার নয়, পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত বিএসএফ ও শুল্ক দফতরের অন্তত ১২ জন আধিকারিক। এদের মধ্যে ৭ জন বিএসএফ ও ৫ জন শুল্ক দফতরের আধিকারিক। পাচারকারী এনামুল হক-সহ আরও ৩ ব্যবসায়ীর জঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন তাঁরা। তবে এধরনের সরকারী প্রতারণাতে আর কার কার নাম উঠে আসবে সেটাই দেখার।

এর আগেও এধরনের ঘটনায় সরকারের তাবড় নেতারা জড়িয়ে পরেছেন বহুবার। এবার কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় থাকায় স্বভাবতই রাজ্যের শাসক দল একটু হলেও চিন্তায় আছে। প্রচার যতই জোরালো হোক না কেন, সিবিআই এর খাতায় নাম লেখালে ছাড় পাওয়া যাবে না প্রতিদ্বন্দ্বী দের কাছ থেকে। সেইসঙ্গে ভোটব্যাঙ্ক নিয়েও পড়তে পারে টানাটানি। আমজনতা এখন সিবিআই এর ভরসায়। এদিকে সিবিআই আধিকারিকদের ইঙ্গিতে ভীত শাসক তো বটেই এমনকি বিরোধী পক্ষের অনেকেই! ওয়াকিবহাল মহলের মতে নির্বাচন আসছে ২১ সালে, তার আগে এই গরুপাচার কাণ্ড ভূমিকা নিতে পারে সারদা বা নারদ ইস্যুর মতই। কিন্তু কিভাবে? উত্তর দেবে সময়।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

বিজ্ঞাপন

আরও খবর