শ্রাবণ মাসেই কেন ঘটা করে শিবপুজো হয়? সংসারে সকলের ভালোর জন্যে এবং সুখশান্তির জন্যে কত কিছুই না করি আমরা। যাঁরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী তাঁরা পূজার্চনা করেন। কথায় আছে ভগবানকে ভক্তি ভরে মন থেকে ডাকলে তিনি তাঁর ভক্তের কথা ঠিক শোনেন। তাহলে কেন শুধু শ্রাবণ মাসেই শিবের বিশেষ আরাধনা করা হয়? বিশ্বাস, এই সময়-পর্বে পার্বতীর সঙ্গে শিব তাঁর শ্বশুরবাড়িতে বাস করেন। কেন থাকেন? তারও কারণ আছে।
শিব রাজা দক্ষের কাছে কথা দিয়েছিলেন তিনি এই শ্রাবণ মাসভর তাঁর বাড়িতে থাকবেন। যেখানে শিবের এই নিবাসপর্ব চলবে সেটিই পরে বিখ্যাত দক্ষেশ্বর মহাদেব হিসেবে খ্যাত হয়। এই মন্দির এখন হরিদ্বারের কনখলে। সেই মতোই শিবকে মাসভর ভক্তেরা বড় আপন করে কাছে পান আর তাই তাঁর পূজা পর্ব পালন করেন, সারা মাস জুড়ে করেন ব্রত।



অন্য আরেকটি দিক হল, পুরাণ মতে এই শ্রাবণ মাসেই বিষ পান করেছিলেন শিব। বিষ পানের ফলে তাঁর সারা শরীর নীল হয়ে যায়। সেই কারণেই তাঁর মাথায় জল বা দুধ ঢেলে পুজো করা হয়। শ্রাবণ মাসের প্রতিদিনই এই আচার পালন করা হয়। তবে যেহেতু সোমবার শিবের বার বলেই পরিচিত, তাই সোমবারেই বিশেষ পুজো হয়। শ্রাবণ মাসের ৪টি বা ৫টি সোমবার ধূমধাম করে পুজো করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস শিবের পুজোয় দূর হয় জীবনের সব সমস্যা।
‘শ্রাবণ’ শব্দটি এসেছে ‘শ্রবণ’ থেকে। তাই এই সময় শুভ কথা শোনা ভালো। শ্রাবণ মাসের প্রতি সোমবার শিবের মাথায় জল ঢালেন অনেকেই। নিজের সংসার, সন্তানের মঙ্গল কামনায় শিবের পুজো চলে শ্রাবণ মাসভর। কথায় বলে দেবাদিদেব মহাদেব। অর্থাৎ সব ঈশ্বরের সেরা শিব! সেই ঈশ্বরের পুজোয় সব মনস্কামনা পূরণ হবে। শান্তি মিলবে জীবনে। শ্রাবণ মাস নিয়ে এরকম আরও অনেক কথা প্রচলিত আছে।
শিবের মাস পবিত্র ‘শাওন’, বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী ১ শ্রাবণ থেকে এটি শুরু। আর শিবভক্তদের কাছে সোমবার বরাবরই বিশেষ। শ্রাবণ মাসের প্রথম সোমবার পড়েছে এই বছর ২১ জুলাই। বাকি ভারতের সঙ্গে শিবের আরাধনায় এদিন মেতে উঠবে বাংলাও। আসলে শিবের পুজো করলেই তাঁর আশীর্বাদ পাওয়া যায়। তবে শ্রাবণ মাসে শিবপুজো করলে তার বিশেষ ফল পাওয়া যায় বলে উল্লেখ রয়েছে শাস্ত্রে।



তবে শিবপুজোর কতগুলি বিশেষ বিধি রয়েছে :
- প্রতিদিন ২১টি বেলপাতায় চন্দন মাখিয়ে ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ লিখে শিবলিঙ্গে অর্পণ করতে হবে।
- রোজ সকালে স্নানের পরে শিবমন্দিরে গিয়ে শিবের জলাভিষেক সম্পন্ন করতে হয়, অর্পণ করতে হয় কালো তিল। মন্দিরে কিছুক্ষণ ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ মন্ত্র জপ করা বিধেয়।
- শ্রাবণের কোনও একটি সোমবার জলে দুধ ও কালো তিল দিয়ে শিবলিঙ্গের অভিষেক করলে ভালো। অভিষেকের জন্য তামার পাত্রের পরিবর্তে অন্য কোনও ধাতুর পাত্র ব্যবহার করুন। এক্ষেত্রেও অভিষেকের সময়ে মন্ত্র জপ করতে হয়।
- বিবাহে বাধা এলে শ্রাবণ মাসে রোজ শিবলিঙ্গে জাফরান মিশ্রিত দুধ অর্পণ করা বিধি। এটি করলে নাকি শীঘ্র বিবাহযোগ দেখা দেয়।
এগুলি করলে কী কী ফললাভ হয়:
এই সব বিধি মেনে গোটা শ্রাবণ মাস শিবের পুজো করলে ভক্তের সমস্ত মনস্কামনা পূর্ণ হয়। মানসিক শান্তি মেলে, রোগ-শোক দূর হয়। জটিল রোগমুক্তিও ঘটে। শ্রাবণ মাসে রোজ শিবলিঙ্গে জাফরান মিশ্রিত দুধ অর্পণ করলে বিবাহে বাধা কেটে যায়, শীঘ্র বিবাহযোগ দেখা দেয়। শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের এই শিব-আরাধনার দিকে তাকিয়ে থাকেন সমস্ত শিবভক্তেরা। এ যেন তাঁদের বড় আনন্দের তিথি।
শ্রাবণ মাসেই কেন ঘটা করে শিবপুজো হয়? কিসে তুষ্ট হবেন দেবাদিদেব মহাদেব?

তবে শ্রাবণে শিব পুজোর পিছনে সমাজবিজ্ঞানের কিছু ব্যখ্যা রয়েছে। শিব মানেই সৃষ্টি। শ্রাবণ মাসে বৃষ্টি হয়, উর্বর হয়ে ওঠে জমি। বপন, কর্ষণের জন্য আদর্শ সময়। একদিকে যেমন জমিতে নতুন ফসল ফলানোর সময় এই শ্রাবণ মাস অন্যদিকে পশুপাখিদের মিলনের সময় এই মাস। সেই কারণে অধিকাংশ ন্যাশনাল পার্কগুলো এই সময় বন্ধ থাকে। শিব সৃষ্টির প্রতীক। তাই এই মাসে তিনি পূজিত হন।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



