সরকারি কর্মীদের ছুটির সংখ্যায় গোটা দেশের মধ্যে কার্যত শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, বছরে রাজ্য সরকারি কর্মীরা উপভোগ করেন ৫৩ দিন সরকারি ছুটি—যা দেশের মধ্যে সর্বাধিক। দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রতিবেশী রাজ্য ওডিশা অনেকটাই পিছিয়ে, সেখানে সরকারি ছুটি ৩৪ দিন। এর সঙ্গে যদি ৫২টি শনি ও রবিবার যোগ করা হয়, তা হলে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি কর্মীদের বছরে মোট ছুটি দাঁড়ায় ১৫৭ দিন—অর্থাৎ ৩৬৫ দিনের প্রায় অর্ধেকই ছুটির তালিকায়।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১০ সালের আগে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটির সংখ্যা ছিল অনেক কম। গত দেড় দশকে রাজ্যে ছুটি বেড়েছে ১৮ দিন। সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে সরস্বতী পুজোর আগের দিন, শবে বরাত, দোলের পরের দিন, ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উজ-জোহার আগের দিনের মতো একাধিক ধর্মীয় ও সামাজিক উপলক্ষ।
দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রেও বদল এসেছে। আগে সপ্তমী থেকে চার দিনের ছুটি থাকলেও, বর্তমানে চতুর্থী থেকেই শুরু হয় টানা সরকারি ছুটি—যা রাজ্য প্রশাসনের ছুটির ক্যালেন্ডারকে আরও ‘উদার’ করেছে বলে মত অনেকের।
কেন্দ্র বনাম রাজ্য: ছুটির ফারাক স্পষ্ট
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রে ছুটির কাঠামো তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত। কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ছুটি ১৭ দিন। তার সঙ্গে ২৯ দিন অপশনাল হলিডে থাকলেও, সেই ছুটি পাওয়ার নিয়ম এক-এক রাজ্যে এক-এক রকম। ২০০৯ সালের তুলনায় কেন্দ্রীয় কর্মীদের ছুটির সংখ্যা খুব বেশি না বাড়লেও, অপশনাল হলিডের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ছুটি নিয়ে মতভেদ কর্মচারী সংগঠনগুলির
এত ছুটি নিয়ে কর্মচারী সংগঠনগুলির মধ্যেই মতবিরোধ স্পষ্ট। তৃণমূল প্রভাবিত রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশন-এর আহ্বায়ক প্রতাপ নায়েকের মতে,
“কর্মচারী–দরদি মুখ্যমন্ত্রী কর্মীদের প্রয়োজন বোঝেন। উৎসব ও সামাজিক অনুষ্ঠানে ছুটি বাড়লে কর্মীদের মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা বাড়ে।”
তবে কংগ্রেস প্রভাবিত Confederation of State Employees Federations-এর নেতা মলয় মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য সম্পূর্ণ উল্টো। তাঁর কথায়,
“আমরা এই ছুটির সংস্কৃতির বিরোধী। ছুটি নয়, রুটি চাই। একদিকে বকেয়া ডিএ না দিয়ে কর্মীদের বঞ্চনা করা হচ্ছে, অন্যদিকে অফিস বন্ধ রেখে পরিকাঠামোগত খরচ কমিয়ে সরকার আয় বাড়াচ্ছে।”
কর্পোরেট দুনিয়ার চোখে ছুটির সংস্কৃতি
মজার বিষয় হল, এই ছুটির সংস্কৃতির ইতিবাচক দিক দেখছেন তথ্যপ্রযুক্তি ও কর্পোরেট দুনিয়ার একাংশ। তাঁদের মতে, গোটা বিশ্বেই পাঁচ দিনের কর্মসপ্তাহ থেকে চার দিনের উইক নিয়ে আলোচনা চলছে। এক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার মানবসম্পদ বিভাগের আধিকারিকের বক্তব্য,
“জাপানে ইতিমধ্যেই একটি সংস্থা চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে।”
এক বহুজাতিক সংস্থার মানবসম্পদ কর্তার মতে,
“বেসরকারি ক্ষেত্রে কাজের চাপ অনেক বেশি। ছুটি বাড়ালে কাজের দিনে কর্মীদের কাছ থেকে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়। তাই ছুটি মানেই কর্মসংস্কৃতি নষ্ট—এই ধারণা একপেশে।”
বিচার বিভাগেও আলাদা ছুটির ক্যালেন্ডার
পশ্চিমবঙ্গে বিচার বিভাগের জন্য রয়েছে আলাদা ছুটির ক্যালেন্ডার। সরকারি ছুটির বাইরেও আদালতগুলিতে অতিরিক্ত ছুটি থাকায় কর্মসংস্কৃতি নিয়ে মাঝেমধ্যেই কটাক্ষ শোনা যায়। এই প্রসঙ্গে কলকাতা হাইকোর্ট-এর এক বর্ষীয়ান আইনজীবীর মন্তব্য,
“কর্পোরেট কর্মীদের কাজের চাপ আর সরকারি কর্মীদের চাপ এক নয়। তুলনাটাই ভুল। তাই এই বিতর্ক না বাড়ানোই ভালো।”
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—তা আজ রাজনৈতিক বিতর্ক, কর্মসংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।






