বাল্যবিবাহ রুখতে বাড়ি বাড়ি অভিযান, বন্ধ হতে পারে ভাতা! পুরোহিত-কাজিদের জেলের হুঁশিয়ারি

বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে বাড়ি বাড়ি অভিযান চালানোর ঘোষণা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের। নাবালিকার বিয়েতে পুরোহিত-কাজিদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা, বয়সের প্রমাণ না দিতে পারলে স্বামীদের শাস্তির হুঁশিয়ারি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিবাহ রুখতে এবার বাড়ি বাড়ি অভিযান চালানোর কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। নাবালিকার বিয়ে হলে শুধু বর-কনের পরিবার নয়, বিয়ে দেওয়া পুরোহিত বা কাজির বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের সঙ্গে যুক্তদের সরকারি ভাতা বন্ধ করা এবং ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যাওয়া নাবালিকা বধূদের স্বামীদের শোকজ করার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বাল্যবিবাহের ঘটনা চিহ্নিত করে দ্রুত পদক্ষেপ করবে প্রশাসন। ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়ের এবং ২১ বছরের কম বয়সি ছেলের বিয়ে আইনত নিষিদ্ধ। এই আইন অমান্য করে বিয়ে হলে সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বার্তা দিয়েছেন তিনি।

বাল্যবিবাহের ঘটনায় শুধু বর বা কনের পরিবারের সদস্যদেরই নয়, বিয়ের সঙ্গে যুক্ত পুরোহিত ও কাজিদেরও আইনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, নাবালিকার বিয়ে সম্পন্ন করতে যাঁরা সহযোগিতা করবেন, তাঁরাও দায় এড়াতে পারবেন না। তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (Bharatiya Nyaya Sanhita)-সহ প্রযোজ্য আইনে পদক্ষেপ করা হবে।

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত জেল এবং এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। রাজ্যজুড়ে এই ধরনের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

শুধু নতুন করে বিয়ে আটকানো নয়, ইতিমধ্যে বাল্যবিবাহ হয়ে গিয়েছে এমন ঘটনাগুলিও খতিয়ে দেখবে প্রশাসন। রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের মাধ্যমে নাবালিকা বধূদের পরিবার এবং তাঁদের স্বামীদের কাছে শোকজ নোটিস পাঠানোর কথা জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট স্বামীকে প্রমাণ করতে হবে যে তাঁর স্ত্রী বিয়ের সময় ১৮ বছর পূর্ণ করেছিলেন। বয়স প্রমাণের ক্ষেত্রে স্কুলের শংসাপত্র, আধার কার্ড, জন্মের শংসাপত্র-সহ বৈধ নথি পেশ করতে হবে। যথাযথ প্রমাণ দেখাতে না পারলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

বাল্যবিবাহের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সরকারি সুবিধা নিয়েও কড়া অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধরনের ঘটনায় সরকারি ভাতা বন্ধ করার পদক্ষেপও করা হবে। অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধা নেওয়া ব্যক্তিরা আইন ভাঙলে তার প্রভাব সরকারি সুবিধার উপরও পড়তে পারে।

ঐতিহাসিক ভাবে বাংলায় বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (Ishwar Chandra Vidyasagar) নাম জড়িয়ে রয়েছে। উনিশ শতকে এই সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর আন্দোলন এবং বিধবা বিবাহের পক্ষে প্রচার বাংলার সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

স্বাধীনতার পরে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে কেন্দ্রীয় আইন আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। বর্তমান আইনি কাঠামোয় মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৮ বছর এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ বছর বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্ধারিত। তা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন অংশের মতো পশ্চিমবঙ্গেও বাল্যবিবাহের অভিযোগ সামনে আসে।

বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এবং কিছু প্রত্যন্ত এলাকায় এই প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। সরকারের নতুন পদক্ষেপে তাই নজর দেওয়া হচ্ছে শুধু বিয়ের অনুষ্ঠানের উপর নয়, বাড়ি বাড়ি গিয়ে বয়স, বিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের উপরও।

প্রশাসনের এই অভিযানের মূল লক্ষ্য এখন একটাই—নাবালিকার বিয়ে হওয়ার আগেই তা চিহ্নিত করে বন্ধ করা। পাশাপাশি ইতিমধ্যে এমন বিয়ে হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। ফলে বাল্যবিবাহ রুখতে রাজ্য সরকারের এই অভিযান কতটা কার্যকর হয়, আগামী দিনে তার দিকেই নজর থাকবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন