পালাবদলের পর বাংলায় শিল্পায়নের গতি বাড়ানোর বার্তা। বুধবার কলকাতার মিলনমেলা প্রাঙ্গণ থেকে ১১টি শিল্পতালুকে ৩৩টি শিল্প সংস্থার হাতে জমির অ্যালটমেন্ট লেটার তুলে দিল রাজ্য সরকার। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলির মোট বিনিয়োগ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা এবং এর মাধ্যমে প্রায় ৬২ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সরকারি সূত্রে দাবি।
হরিণঘাটা, খড়্গপুর, পানাগড়, রঘুনাথপুর, ফলতা, উলুবেড়িয়া, কল্যাণী, নৈহাটি, কোচবিহার, সল্টলেক এবং অঙ্কুরহাটিতে এই শিল্প প্রকল্পগুলির জন্য জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, সৌরবিদ্যুৎ, ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মা, স্টিল, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বস্ত্র-সহ একাধিক ক্ষেত্রে শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে শিল্পপতিদের দ্রুত কাজ শুরু করার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, অ্যালটমেন্ট লেটার হাতে পাওয়ার পর আর দেরি না করে প্রকল্পের কাজ শুরু করা উচিত। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী নিজে গিয়ে যাতে প্রকল্পের উদ্বোধন করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই দ্রুত কাজ শুরুর বার্তা দেন তিনি।
শুভেন্দু বলেন, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা ছিল সদিচ্ছার অভাব। তাঁর দাবি, এবার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। শুধু চাকরির সুযোগ তৈরি নয়, বাংলার তরুণ-তরুণীদের উদ্যোগপতি হিসেবেও গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
শিল্পের জন্য জমির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, শিল্প আকাশে বা জলে তৈরি হয় না। বন্দরের জন্য জল প্রয়োজন হলেও কারখানা ও শিল্প পরিকাঠামোর জন্য জমি অপরিহার্য। পুজোর আগেই নতুন জমি নীতি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
অতীতের শিল্পনীতি নিয়ে বিরোধীদের নিশানা করেন শুভেন্দু। বাম আমলের শিল্পনীতি এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শিল্পায়নের উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শিল্পের বিষয়ে তৎকালীন সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও দলীয় নীতির কারণে বহু ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে তৃণমূল সরকারের জমি নীতিরও সমালোচনা করেন তিনি।
তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে বর্তমান সরকারের শিল্পনীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে উঠে এসেছে দ্রুত জমি বরাদ্দ, বিনিয়োগ টানা এবং কর্মসংস্থান তৈরি। এর আগে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজ্য সরকারের বৈঠক হয়েছে। আদানি গোষ্ঠীর পাশাপাশি রিলায়েন্সের সঙ্গেও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রকাশিত রিপোর্টে উঠে এসেছে।
শিল্পপতিদের আশ্বস্ত করতে নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক সহযোগিতার কথাও বলেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, নতুন সরকার ক্ষমতার অপব্যবহার বা পুলিশের অপব্যবহার করবে না। শিল্পপতিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাংলায় বিনিয়োগ করলে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে এবং কোনও সমস্যা হলে সরকারের হেল্পলাইনে জানানো যাবে।
বিনিয়োগের সঙ্গে ইনসেনটিভের বিষয়টিও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, যত বেশি বিনিয়োগ হবে এবং যত বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে, সেই অনুযায়ী শিল্প সংস্থাগুলিকে ইনসেনটিভ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক শিল্পপতিদের রাজ্যে এসে কাজ শুরু করার আহ্বানও জানান তিনি।
একই সঙ্গে রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথাও স্বীকার করেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের আর্থিক অবস্থা এখন ভালো নয়। সেই পরিস্থিতি বদলাতে শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। শিল্প সংস্থাগুলির সঙ্গে সরকার একসঙ্গে কাজ করবে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
জমি বরাদ্দের এই উদ্যোগের পাশাপাশি আগামী দিনে আরও বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বুধবারের অনুষ্ঠানটির আগে মুখ্যমন্ত্রী মুকেশ আম্বানির সঙ্গে মুম্বইয়ে বৈঠক করেছিলেন। সেই বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
ফলে ৩৩টি শিল্প সংস্থার হাতে জমির অ্যালটমেন্ট লেটার তুলে দেওয়াকে রাজ্যের শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ কত দ্রুত বাস্তব প্রকল্পে পরিণত হয় এবং ঘোষিত কর্মসংস্থানের কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটাই এখন নজরে।



