ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং কোলেস্টেরলের সমস্যা এখন অনেক পরিবারের পরিচিত বাস্তবতা। তবে চিকিৎসকদের মতে, এই অসংক্রামক রোগগুলির (NCDs) প্রভাব শুধু হার্ট, লিভার বা কিডনিতেই সীমাবদ্ধ নয়। নীরবে বাড়ছে আরও একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি— ভ্যাসকুলার ডিজিজ বা রক্তনালির রোগ। সাম্প্রতিক সময়ে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সতর্কবার্তা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ভ্যাসকুলার রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের মধ্যে এই ঝুঁকি অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। রক্তনালির ক্ষতি ধীরে ধীরে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির কার্যক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভ্যাসকুলার রোগ কী?
ভ্যাসকুলার রোগ বলতে ধমনী ও শিরার বিভিন্ন ধরনের সমস্যাকে বোঝানো হয়, যা শরীরের স্বাভাবিক রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। রক্তনালি সংকুচিত, ব্লক বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছতে সমস্যা হয়।
অনেকের ধারণা, এই ধরনের সমস্যা শুধুমাত্র হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত। কিডনি, চোখ, মস্তিষ্ক এবং পায়ের রক্তসঞ্চালনেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
চিকিৎসকদের মতে, ৪০ থেকে ৫৫ বছর বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে এই রোগের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে যাঁদের ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা বা উচ্চ কোলেস্টেরল রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
দীর্ঘদিন ধরে রক্তে অতিরিক্ত শর্করা এবং উচ্চ রক্তচাপ রক্তনালির দেওয়ালকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনির অসুখ, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
কোন লক্ষণগুলিকে গুরুত্ব দেবেন?
ভ্যাসকুলার রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর প্রাথমিক উপসর্গগুলি অনেক সময় সাধারণ শারীরিক ক্লান্তি বা বয়সজনিত সমস্যা বলে মনে হয়। ফলে অধিকাংশ মানুষ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না।
হাঁটার সময় পায়ে ব্যথা, পা ফুলে যাওয়া, অবশ অনুভূতি, দীর্ঘদিন ক্লান্তি থাকা, ক্ষত শুকোতে দেরি হওয়া, মাথা ঘোরা কিংবা হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন— এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ এগুলি রক্তসঞ্চালনজনিত সমস্যার প্রাথমিক সতর্কবার্তা হতে পারে।
কেন বাড়ছে এই রোগ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক জীবনযাত্রা এই সমস্যার অন্যতম কারণ। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম না করা, ধূমপান, অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা রক্তনালির স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এর পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবিটিস ও উচ্চ রক্তচাপও ধীরে ধীরে রক্তনালির ক্ষতি করে। ফলে রোগটি অনেক সময় অজান্তেই শরীরে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্যাসকুলার রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব যদি শুরু থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা যায়। নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখা, ধূমপান বর্জন এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো সতর্ক হলে রক্তনালির রোগের মতো নীরব কিন্তু বিপজ্জনক সমস্যাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।



