ডিজেলের জোগান বাড়াতে পুতিনের সঙ্গে চুক্তি ট্রাম্পের, ক্ষুব্ধ ইউক্রেন

রাশিয়া থেকে প্রথম দফায় ৩ লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি ডিজ়েল সরবরাহের ঘোষণা ট্রাম্পের। নভেম্বরে আরও জ্বালানি আসার কথা। তবে মার্কিন বাজারে দামের স্থায়ী পতন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

বিশ্ববাজারে ডিজ়েলের জোগান বাড়িয়ে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে চুক্তির কথা ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের জেরে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজ়েল বাজারে আনার পরিকল্পনা করেছে আমেরিকা। তবে এই উদ্যোগে মার্কিন বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘমেয়াদে কমবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, রাশিয়া অবিলম্বে আমেরিকা-সহ বিশ্ববাজারে ৩ লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি ডিজ়েল সরবরাহ করবে। নভেম্বরে আরও ৫ লক্ষ টন এবং তার পরবর্তী সময়ে আরও ১০ লক্ষ টন ডিজ়েল পাঠানোর কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি রাশিয়ার শোধনাগারগুলির পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে অতিরিক্ত ৩০ লক্ষ টন ডিজ়েল সরবরাহের কথাও বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে এই পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের সময়সূচি ও বাস্তবায়ন নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে।

রাশিয়া থেকে ডিজ়েল আমদানির পথ খুলতে মার্কিন ট্রেজ়ারি বিভাগও সাময়িক ছাড় দিয়েছে। ৯ অক্টোবর জারি করা লাইসেন্স অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে রুশ ডিজ়েল আমদানির অনুমতি ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সিদ্ধান্ত রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি এবং ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা নীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

আমেরিকার অর্থনীতিতে ডিজ়েলের গুরুত্ব যথেষ্ট। কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহণ, শিল্প এবং বাড়ি গরম রাখার মতো একাধিক ক্ষেত্রে এই জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজ়েলের দাম বাড়লে পরিবহণ খরচের পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে ঘিরে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমেরিকায় ডিজ়েলের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। বৃহস্পতিবার প্রতি গ্যালন ডিজ়েলের গড় দাম ছিল ৬.২৮ ডলার। ট্রাম্পের ঘোষণার পর ডিজ়েল ফিউচার্সের দাম কমে প্রতি গ্যালন প্রায় ৪.৬৪ ডলারে নেমে আসে। অর্থাৎ বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও, সেই পতন সাধারণ ক্রেতার পাম্পে জ্বালানির দামে কতটা প্রতিফলিত হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, রাশিয়ার কাছ থেকে অতিরিক্ত ডিজ়েল পাওয়া বাজারের সরবরাহের চাপ কিছুটা কমাতে পারে। কিন্তু আমেরিকার বিপুল চাহিদা এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির ঘাটতির তুলনায় এই সরবরাহ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে ফিউচার্সের দামে পতন ঘটলেও দীর্ঘমেয়াদে ডিজ়েলের দাম কমে থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চাপও তৈরি করছে। ৩ নভেম্বরের মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচনের আগে জ্বালানির খরচ কমানো রিপাবলিকানদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের ঘোষিত চুক্তি সেই চাপ সামলানোর প্রচেষ্টার অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে।

এই চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হল রাশিয়ার আর্থিক লাভের সম্ভাবনা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে মস্কোর উপর একাধিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলি। রাশিয়ার জ্বালানি রফতানির উপর বিধিনিষেধ আরোপের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশটির আয় কমিয়ে যুদ্ধ চালানোর আর্থিক সক্ষমতা সীমিত করা।

এবার রুশ ডিজ়েল আমদানির ক্ষেত্রে সাময়িক ছাড় দেওয়ায় সেই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাশিয়া যদি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিক্রি করতে পারে, তা হলে তার রাজস্ব বাড়তে পারে। সেই অর্থের একটি অংশ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা কিয়েভের।

তবে চুক্তির ঘোষিত পরিমাণের কতটা বাস্তবে সরবরাহ করা হবে এবং তা থেকে রাশিয়ার কতটা অতিরিক্ত আয় হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। রাশিয়ার জ্বালানি শোধনাগারগুলির উৎপাদন ক্ষমতা এবং সরবরাহের বাস্তব পরিস্থিতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

রাশিয়ার সঙ্গে এই জ্বালানি চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সমাজমাধ্যম এক্সে তিনি জানিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা প্রশমনের কোনও স্পষ্ট চুক্তি ছাড়া রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা দুর্বলতার পরিচয়। তাঁর বক্তব্য, পুতিনকে এভাবে সুবিধা দিলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনও লাভ হবে না।

জেলেনস্কির আশঙ্কা, জ্বালানি বিক্রি থেকে রাশিয়ার আয় বাড়লে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক শক্তিও বাড়তে পারে। তাঁর মতে, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর উপর ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করার বিনিময়ে রাশিয়াকেও ইউক্রেনের জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে হবে। এই ধরনের পারস্পরিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই উত্তেজনা কমানো সম্ভব বলে মনে করে কিয়েভ।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের ঘোষণার লক্ষ্য হল জ্বালানির জোগান বাড়িয়ে বাজারের চাপ কমানো। ফলে এক দিকে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, অন্য দিকে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার উপর চাপ বজায় রাখা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে।

রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত ডিজ়েল বাজারে এলে সরবরাহের ঘাটতি কিছুটা কমতে পারে। তবে যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পরিবহণ ও উৎপাদনে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার সম্পূর্ণ সমাধান এই চুক্তিতে হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

আরও একটি বড় বাধা হল রাশিয়ার শোধনাগারগুলির অবস্থা। ইউক্রেনের হামলায় কয়েকটি রুশ জ্বালানি পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন ও রফতানির ক্ষমতা প্রভাবিত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ঘোষিত অতিরিক্ত সরবরাহের সবটাই নির্ধারিত সময়ে বাজারে পৌঁছবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

এদিকে, আমেরিকায় নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন ও শোধন ক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই লক্ষ্যে ঠান্ডাযুদ্ধের সময়কার ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প-পুতিন ডিজ়েল চুক্তি জ্বালানির বাজারে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি, রাশিয়ার উৎপাদন ক্ষমতা এবং যুদ্ধের গতিপ্রকৃতির উপরই এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে। তাই আপাতত ডিজ়েলের দামে পতনের সম্ভাবনা থাকলেও, স্থায়ীভাবে দাম কমবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় আসেনি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন