বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকটে বাংলাদেশের শিল্পখাতে বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে বস্ত্রশিল্পে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হচ্ছে। নরসিংদীতে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে যাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে শতাধিক ছোট-বড় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে বলে স্থানীয় শিল্পমহল জানিয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর-সহ ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও উৎপাদন কমেছে, কোথাও আবার কর্মীদের ছুটিতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন কারখানা মালিকরা।
নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের চাপ কম ছিল। কারখানাগুলি কোনও রকমে শিফট কমিয়ে বা সীমিত উৎপাদনের মাধ্যমে কাজ চালাচ্ছিল। কিন্তু অগস্টের মাঝামাঝি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। শিল্পকারখানায় স্বাভাবিক ভাবে প্রায় ১৫ PSI গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হলেও কোথাও তা ২-৪ PSI-তে নেমে যায়, পরে কয়েকটি এলাকায় প্রায় শূন্যে পৌঁছয়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নরসিংদীর বস্ত্রশিল্পে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, জেলায় ১০০-র বেশি কারখানায় পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আরও বহু কারখানা নামমাত্র উৎপাদন চালাচ্ছে। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কিছু কারখানায় কাঠ জ্বালিয়ে বয়লার চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু তাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিক ক্ষমতায় কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায় উৎপাদনের পরিসংখ্যানেও। নরসিংদীর কিছু কারখানায় উৎপাদন ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কোথাও আবার স্বাভাবিক উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। একটি কারখানা দৈনিক এক লক্ষ গজ কাপড় উৎপাদন করলেও গ্যাসের অভাবে তা ৩০ হাজার গজের নিচে নেমে এসেছে বলে শিল্পমহলের দাবি।
শুধু কারখানা বন্ধ হওয়ার সমস্যা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎও। উৎপাদন বন্ধ থাকায় কোনও কোনও কারখানায় শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। কোথাও আবার কর্মীদের দিয়ে যন্ত্রপাতি পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করানো হচ্ছে, যাতে দীর্ঘদিন কাজ না থাকায় তাঁদের উপর প্রভাব কম পড়ে। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে মজুরি দেওয়া এবং কারখানা চালু রাখা নিয়েই মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংকটের আঁচ শুধু নরসিংদীতেই সীমাবদ্ধ নয়। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় বস্ত্র, ডাইং, স্পিনিং ও অন্যান্য কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ‘ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এই কারখানাগুলির উপর চাপ বাড়লে তার প্রভাব রফতানি সরবরাহশৃঙ্খলেও পড়তে পারে।
এই সংকটের পিছনে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। নরসিংদীর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, একটি LNG টার্মিনালে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে নরসিংদী ও আশপাশের এলাকায় গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি বাড়িঘর ও পরিবহণ ক্ষেত্রও এর প্রভাবের মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, গ্যাসের জোগান নিয়ে শিল্পমহলে আরও একটি অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার উৎপাদন বাড়ানোর ফলে শিল্পাঞ্চলের জন্য বরাদ্দ গ্যাসের উপর চাপ তৈরি হয়েছে। ওই সার কারখানাকে পূর্ণ ক্ষমতায় চালানোর সিদ্ধান্তের পর নরসিংদীর শিল্প ইউনিটগুলিতে সরবরাহ আরও কমেছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ইতিমধ্যেই গ্যাস সংকটের কারণে পোশাক উৎপাদন ক্ষমতা ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছিল বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BGMEA)। জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন, রফতানি, শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং কারখানাগুলির আর্থিক স্থিতি—সবকিছুর উপরই চাপ আরও বাড়তে পারে।
ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার চ্যালেঞ্জ নয়, শিল্প ও কর্মসংস্থানকে সচল রাখার প্রশ্নও বড় হয়ে উঠেছে। নরসিংদীর শতাধিক কারখানা বন্ধের ঘটনা সেই সংকটেরই বড় সতর্কসংকেত। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই অচলাবস্থা আরও শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।



