নজরবন্দি ব্যুরো: ইরানকে চাপে ফেলতে আপাতত নতুন করে সামরিক হামলার বদলে অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক আলোচনাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এখন ‘লো-কী’ পদ্ধতিতে এগোচ্ছে এবং ইরানের অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে কাজে লাগিয়েই তেহরানকে চুক্তির পথে আনতে চাইছে। একই সময়ে ওমানের মধ্যস্থতায় স্ট্রেইট অব হরমুজ (Strait of Hormuz) দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রবিবার Axios-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আমেরিকা ইরানের সঙ্গে ‘সেমি-নেগোশিয়েটিং’ করছে। অর্থাৎ আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ নেই, আবার পূর্ণাঙ্গ আলোচনাতেও ফিরছে না ওয়াশিংটন। তাঁর বক্তব্য, ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে এবং মূল্যবৃদ্ধি ও আর্থিক সংকটের কারণে দেশটির উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
ট্রাম্প বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, এপ্রিল থেকে চালু থাকা মার্কিন নৌ অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে চাপ বাড়িয়েছে। তাঁর দাবি, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ইরানের পক্ষে নিজেদের সেনাদের বেতন মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে এই বক্তব্যের সব দাবির স্বাধীন যাচাই ওই সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ গত কয়েক মাস ধরে ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অবরোধও ওয়াশিংটনের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এখন নতুন সামরিক পদক্ষেপের বদলে সেই অর্থনৈতিক চাপকে আরও কার্যকর করে তোলার দিকেই ট্রাম্প প্রশাসন নজর দিচ্ছে বলে তাঁর বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলেছে।
ট্রাম্পের মতে, আমেরিকার জন্য পরিস্থিতির আরেকটি ইতিবাচক দিক হল তেলের দাম কমে আসা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫ ডলারের সামান্য উপরে থাকায় মার্কিন সাধারণ মানুষের উপর জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমেছে। তিনি পরিস্থিতিকে ‘দাবার খেলা’র সঙ্গে তুলনা করে বলেন, শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ঠিক হয়ে যাবে।
এদিকে ইরান ও ওমানের মধ্যে স্ট্রেইট অব হরমুজ নিয়ে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জলপথে নতুন একটি শিপিং রুট চালুর জন্য প্রয়োজনীয় ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক নিয়ে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং একটি যৌথ ঘোষণার কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে এই সমঝোতা নিজে থেকেই হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।
তেহরানের অবস্থানও স্পষ্ট। আমেরিকা তার আচরণ সংশোধন না করা পর্যন্ত জলপথ পুরোপুরি খুলে দেওয়ার প্রশ্নে ইরান আপস করতে চাইছে না। মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, সামরিক অভিযান বন্ধ এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ—এই দাবিগুলিই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
জুনে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, কয়েক সপ্তাহ পরেই তা ভেঙে যায়। স্ট্রেইট অব হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ও জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ পরিস্থিতিকে ফের সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। এরপরও ইরানের পক্ষ থেকে কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে বিচ্ছিন্ন হামলার খবর সামনে এসেছে।
সংঘাতের প্রভাব শুধু আমেরিকা ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হুথিরাও (Houthis) আঞ্চলিক সমুদ্রপথকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করেছে। ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্বাভাবিক করা এখন কেবল দুই দেশের কূটনৈতিক সমঝোতার বিষয় নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গেও তা জড়িয়ে রয়েছে।
এর পাশাপাশি গাজা ও লেবাননকে ঘিরে সামরিক অভিযান কমানোর গতি নিয়েও ওয়াশিংটন ও ইজরায়েলের মধ্যে মতপার্থক্যের খবর এসেছে। ফলে একই সময়ে একাধিক ফ্রন্টে সংঘাত কমানোর চেষ্টা এবং ইরানের উপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার কৌশলই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে বড় পরীক্ষা।
সব মিলিয়ে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে আপাতত নতুন সামরিক অভিযানের বদলে অর্থনৈতিক চাপ, নৌ অবরোধ এবং সীমিত কূটনৈতিক যোগাযোগ—এই তিন পথেই এগোতে চাইছে ওয়াশিংটন। তবে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ওমানের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছয়, তার উপরই পরবর্তী পরিস্থিতির বড় অংশ নির্ভর করছে।



