মধ্যপ্রাচ্যে চলতে থাকা সংঘাত থামাতে ইরানের ৭ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ঘিরে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক সম্ভাবনায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। Wall Street Journal-এর একটি প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে দাবি করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে ফের হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে সহযোগীদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
এই খবর এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ চলছিল। ফলে একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা, অন্যদিকে ফের সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা—দুই বিপরীত বার্তা একসঙ্গে সামনে এসেছে।
কী প্রস্তাব দিয়েছে ইরান?
ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় স্বাভাবিক নৌ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলি আগেই আলোচিত একটি সমঝোতার কাঠামোর মধ্যে রয়েছে।
এর আগে রয়টার্সও জানিয়েছিল, ১৬ সেপ্টেম্বর মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান আমেরিকার কাছে সংঘাত বন্ধের প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছিল। তেহরানের বক্তব্য ছিল, আমেরিকা সামরিক চাপ কমিয়ে ইরানের বন্দরগুলির উপর অবরোধ প্রত্যাহার করলে হরমুজ প্রণালী এক সপ্তাহের মধ্যে খুলে দেওয়া যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালী এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হওয়ায় এটি খুলে দেওয়ার প্রশ্নটি কেবল আমেরিকা ও ইরানের সম্পর্ক নয়, আন্তর্জাতিক তেলবাজারের উপরও প্রভাব ফেলছে।
আলোচনার পথ কি বন্ধ হয়ে গেল?
সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগের খবর সামনে এসেছিল। রয়টার্স জানিয়েছিল, নিউইয়র্কে দুই পক্ষের মধ্যে একটি ধাপে ধাপে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। সম্ভাব্য কাঠামোয় হরমুজ দিয়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার বিনিময়ে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল করার বিষয়টি ছিল।
এর মধ্যেই Wall Street Journal-এর প্রতিবেদনে ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে নতুন দাবি সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ৭ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করেননি এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ফের ইরানে বোমা হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে সহযোগীদের জানিয়েছেন। তবে এটি সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে প্রকাশিত মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য; ট্রাম্পের প্রকাশ্য ঘোষণা হিসেবে বিষয়টি উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
ইরানের অবস্থানও কঠোর
কূটনৈতিক আলোচনার দরজা খোলা রাখার পাশাপাশি তেহরানের অবস্থানও যে কঠোর, তা ইরানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট। বিদেশমন্ত্রী আরাঘচি ৭ দিনের প্রস্তাবের কথা জানিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে হরমুজ খুলে দেওয়া সম্ভব এবং এখন সিদ্ধান্ত আমেরিকার হাতে।
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও আত্মরক্ষার অধিকার এবং দেশের সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চললেও তেহরান তাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত অবস্থান থেকে সরে এসেছে—এমন কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনও নেই।
হরমুজই হয়ে উঠেছে আলোচনার মূল কেন্দ্র
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী এখন সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাব্য সমঝোতার অন্যতম প্রধান দর-কষাকষির বিষয়। ইরান চাইছে আমেরিকার অবরোধ ও সামরিক চাপ কমুক, আর ওয়াশিংটনের অন্যতম লক্ষ্য আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা।
ফলে ইরানের ৭ দিনের প্রস্তাব এবং ট্রাম্পের কথিত অবস্থান—দুটি ঘটনাই আগামী দিনের কূটনৈতিক সমীকরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্রশ্ন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা আলোচনা ফের কোনও সমঝোতার দিকে এগোয়, নাকি নভেম্বরের নির্বাচনের পর সংঘাত নতুন করে সামরিক পর্যায়ে পৌঁছয়।



