শিল্পীর মৃত্যুতে শুটিং বন্ধ রাখার কোনো নির্দেশ কোথাও থেকে আসেনা! রাহুলের মৃত্যুতে ফেসবুকে প্রতিবাদ সুদীপ্তার

শুটিং বন্ধ হয় উৎসবের ডাকে, কিন্তু সহশিল্পীর মৃত্যুতে নয়—টলিউডে মানবিকতা বনাম প্রোডাকশনের বাস্তব নিয়ে তীব্র প্রশ্ন সুদীপ্তার।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরুল মঞ্চে বা ধনধান্য অডিটোরিয়ামে ভিড় বাড়াতে হবে বলে যখন তখন শুটিং বন্ধের নির্দেশ দেওয়া যায়, কিন্তু একজন তরুণ অভিনেতার শুটিং চলাকালীনই অকস্মাৎ মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করে আধ বেলা শুটিং বন্ধ রাখার কোনো নির্দেশ কোথাও থেকে আসেনা।

এই ঘটনা নিয়ে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে টলিউডের বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরলেন অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী। তিনি তাঁর ফেসবুকে যা লিখেছেন সেটাই হুবহু তুলে ধরা হল এই প্রতিবেদনে।

তিনি ফেসবুকে লিখেছেনঃ 

” তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়াল, নজরুল মঞ্চে বা ধনধান্য অডিটোরিয়ামে ভিড় বাড়াতে হবে বলে যখন তখন শুটিং বন্ধের নির্দেশ দেওয়া যায়, কিন্তু একজন তরুণ অভিনেতার শুটিং চলাকালীনই অকস্মাৎ মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করে আধ বেলা শুটিং বন্ধ রাখার কোনো নির্দেশ কোথাও থেকে আসেনা।

সরকারী পুরস্কার (???) বিতরণী অনুষ্ঠানে সব শিল্পী ও কলাকুশলী যাতে ‘দলে দলে যোগ দিতে’ পারেন, তাই একটা WhatsApp message এই সব শুটিং ফ্লোর সেই দিনের জন্য স্তব্ধ করে দেওয়া যায়, কিন্তু এক তরুণ সহকর্মীকে শেষ দেখা দেখতে দেবার জন্য ক্যামেরার রোলিং এক ঘণ্টা বন্ধ রাখার কোনো ইমেল বা WhatsApp message কারুর কাছ থেকে আসে না।

শিল্পীদের বিভিন্ন ভূষণে ভূষিত হবার বার্ষিক দৃশ্য সচক্ষে দেখতে পাওয়ার স্বর্গীয় আনন্দ থেকে কোনো শিল্পী বা কলাকুশলী যাতে এ জীবনে বঞ্চিত না হন তা নিশ্চিত করতে সিনেমা, ওয়েব সিরিজ এমনকি দৈনিক ধারাবাহিকের শুটিং ও বন্ধ রাখা যায়, তখন এপিসোড ব্যাঙ্কিং এ টান পড়ে না, টেলিকাস্ট আটকে যাবার ভয় থাকে না, কিন্তু নিজের ভ্রাতৃসম সহশিল্পীকে শেষ দেখা দেখতে যেতে দেবার জন্য আধ ঘণ্টা শুটিং বন্ধ করার নির্দেশ দিতে গেলেই ব্যাঙ্কিং কমে যাবার ভয় জাঁকিয়ে বসে, টেলিকাস্ট আটকে যাবার ভয় থাকে, প্রযোজকদের অনেক বড় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই কোনো নির্দেশ আর আসে না।

নিজের কর্মজগত থেকে একজন অভিনেতার এই তবে মোট প্রাপ্তি?
এই তবে ‘আমাদের একটাই পরিবার’ যেখানে প্রায়ই ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হয় আবার চা সিঙাড়া খেয়ে তা মিটেও যায়?
এই তবে ‘আমাদের টলিউড’?

হে শিল্পী — মনে রেখো তুমি ‘শিল্পী’।
তুমি রিক্সা বা অটো চালাও না, নিদেনপক্ষে সবজি ও বেচো না যে তোমার ইউনিয়ন তোমার মৃত্যুতে দোকান বন্ধ রাখবে।
তুমি ‘দু পয়সার শিল্পী’ মাত্র। কথা বোলোনা বেশি।
যাও গিয়ে নাচো, গান গাও, অভিনয় কর।
তুমি মনের আনন্দ টা ঠিক করে দেখাও।
হাজার কষ্ট বুকে চেপে রেখে লিপস্টিক পমেটম মেখে তুমি প্রেমের অভিনয় টা ভালো করে কর গিয়ে, নাহলেই তোমার ‘কাজ কমে যাবে’, তুমি ‘replaced’ হয়ে যাবে।
তুমি ভয় পাও।
মনে রেখো তোমার পিছনেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে আরো অনেক অনেক শিল্পী, তোমাকে ‘replace’ করার জন্য। তারা সবাই ভালো মুখস্থ করতে পারে, তাই তারা ও সবাই ‘শিল্পী’।
হাজার হাজার ডক্টর হাজরার মত হাজার হাজার শিল্পী। তাই ভয়ে থাকো,চুপ থাকো।
তুমি ঘুড়ি হয়ে আকাশে ওড়ো, আমরা হাততালি দেবো। ভুলেও জানতে চেয়োনা কেন উড়ছো, কে ওড়াচ্ছে, লাটাই টা কার হাতে। জেনে ফেললেও চুপ থেকো, নাহলে ‘ব্যান্’ হয়ে যাবে, তোমার ‘পরিবারের’ লোকেরা, তোমার ‘আত্মীয়’রা তোমার পাশে আর দাঁড়াবে না, তোমার সঙ্গে আর কাজ করতে চাইবে না, চা-সিঙাড়ার ভাগ দেবে না আর।
তাই তুমি চুপ করে উড়তে থাকো, উড়ে উড়ে দূরে চলে যাও, আরও দূরে, অনেক দূরে, যেখানে তোমাকে আর ছোঁওয়া যাবে না। আমরা ড্রোন শটে ধরে রাখবো তোমার ওড়া।
যদি টাল খেয়ে পড়ে যাও, তখন নাহয় বলে দেবো আমরা বলিনি, তুমিই উড়তে চেয়েছিলে, আমাদের স্ক্রিপ্টে ছিল না, তুমিই জোর করেছিলে। তোমাকে আমরা ‘ভালো শিল্পী’ বলে ডাকবো তখন, ‘Perfectionist’ বলে ডাকবো, আর ‘ভালো শিল্পী’ হবার লোভে তুমি উড়ে যাবে আরও দূরে, তারপর আর দেখা হবে না তোমার সঙ্গে।
আমরা আবার ব্যস্ত হয়ে পড়বো নাচের রিহার্সাল করতে– সামনেই আবার একটা Award show এসে যাবে নিশ্চয়ই।”

 

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন