টালিগঞ্জে কি পাল্টাচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য? অরূপ–স্বরূপ যুগের ছায়ায় নতুন ‘ভরকেন্দ্র’ পার্থ ভৌমিক

টালিগঞ্জে অরূপ–স্বরূপের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের মাঝে নৈহাটির পার্থ ভৌমিককে ঘিরে নতুন ভরকেন্দ্রের জল্পনা। রাজনীতি ও বিনোদনের সমীকরণ কি বদলাচ্ছে?

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

দেড় দশকের বেশি সময় ধরে টালিগঞ্জ মানেই এক অঘোষিত ক্ষমতাকেন্দ্র—অরূপ বিশ্বাস ও তাঁর ভাই স্বরূপ। কে কাজ পাবেন, কে ব্রাত্য হবেন, কোন তারকা কোথায় যাবেন—এই সমীকরণে তাঁদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহে টালিগঞ্জের অন্দরমহলে নতুন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: এই ‘নিয়ন্ত্রক’ ব্যবস্থার কি বদল শুরু হয়েছে? আর সেই বদলের মুখ কি নৈহাটির পার্থ ভৌমিক?

যাঁকে এতদিন ‘গোকুলে বেড়ে ওঠা’ বলেই মনে করা হত, সেই পার্থ ইদানীং টালিগঞ্জে ক্রমশ দৃশ্যমান। অভিনয় করছেন, তারকাদের ঘরোয়া পার্টিতে হাজির থাকছেন, ছবির প্রিমিয়ারে আমন্ত্রণ পাচ্ছেন। এই ধারাবাহিক উপস্থিতিই ইঙ্গিত দিচ্ছে—নৈহাটির পার্থ কি টালিগঞ্জের নতুন ‘অরূপ বিশ্বাস’ হয়ে উঠছেন?

পার্থ ভৌমিক নতুন নন। দীর্ঘদিন ধরেই নাট্যজগতের সঙ্গে যুক্ত তিনি। তবে তাঁকে মঞ্চ থেকে পর্দায় নিয়ে আসার কাজটি প্রথম করেন পরিচালক ও বিধায়ক রাজ চক্রবর্তী। পরিচয়ের যোগসূত্রও ছিল—যে কলেজে পার্থের ছাত্ররাজনীতির শুরু, সেখানেই রাজের বাবা ছিলেন অশিক্ষক কর্মচারী। রাজের ওয়েব সিরিজ় ‘আবার প্রলয়’-এ পার্থের পুলিশ অফিসারের চরিত্র এবং ‘হ্যালো স্যার’ সংলাপ তাঁকে নতুন পরিচিতি দেয়। অভিনয় এতটাই নজর কাড়ে যে স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় তাঁর প্রশংসা করেন।

তবে টলিউডের রসিকমহলের মতে, পার্থর উত্থানের পথে অভিনয়ের বাইরেও দু’টি শক্তিশালী অনুঘটক রয়েছে—এক, নৈহাটির বড়মা; দুই, বিরিয়ানি।

প্রথমটি সরাসরি টালিগঞ্জের দুর্গাপুজোর ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। এতদিন অরূপ বিশ্বাসের সুরুচি সঙ্ঘ মানেই তারকাদের ‘অবশ্যপাঠ্য’ গন্তব্য। কিন্তু গত কয়েক বছরে নৈহাটির বড়মার মন্দির এক সমান্তরাল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। দেব–শুভশ্রী থেকে প্রসেনজিৎ—একাধিক তারকা, পরিচালক, প্রযোজক ছবি মুক্তির আগে সেখানে যাচ্ছেন। মন্দিরে লেখা—‘ধর্ম যার যার, বড়মা সবার’—এই বার্তাও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

দ্বিতীয় অনুঘটক বিরিয়ানি। ২০১১-র পর রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে রসনাও। তৃণমূলের কর্মসূচিতে বিরিয়ানি হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ। দক্ষিণে যেমন আরসালান, উত্তরে তেমন দাদা-বৌদির বিরিয়ানি। পার্থ টলিউডের ঘরোয়া অনুষ্ঠানে নিয়মিত আমন্ত্রিত। কখনও নিজে যান, কখনও পৌঁছে যায় বিরিয়ানি—এই ‘সফট পাওয়ার’ও কাজ করছে বলে মত পর্যবেক্ষকদের।

অরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে পার্থর একটি মৌলিক তফাত রয়েছে। তৃণমূলের এক নেতার ভাষায়,
“অরূপ বিশ্বাস ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ন্ত্রণ করলেও তিনি নন-প্লেয়িং ক্যাপ্টেন। অভিনয় করেন না। পার্থ অভিনয় জানেন, বোঝেন—এটাই তাঁর বড় শক্তি।”

ওয়েব সিরিজ়ের পাশাপাশি ব্রাত্য বসুর নাটকেও অভিনয় করেছেন পার্থ। পরিচালকদের একাংশের মতে, তাঁর সঙ্গে অভিনয় নিয়ে কথা বললে সুবিধা হয়—কারণ সমস্যা যেমন বোঝেন, তেমনই সমাধানও।

তবে মূল মঞ্চে রাজনীতির নাটক এখনও চলছে। উইংসের দু’পাশে দুই ঠিকানা—কালীঘাট ও ক্যামাক স্ট্রিট। অরূপ যে কালীঘাটের ‘আস্থাভাজন’, তা সুবিদিত। আবার পার্থ যে ক্যামাক স্ট্রিটে গুরুত্ব পাচ্ছেন, তাও তৃণমূলের অন্দরে গোপন নয়।

নন্দনে সাম্প্রতিক এক প্রদর্শনীতে এই বদলের ইঙ্গিত স্পষ্ট। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পাশের আসনে বসে গোটা ছবি দেখলেন পার্থ। উপস্থিত ছিলেন একাধিক মন্ত্রী ও সাংসদ। নজর কাড়ে অরূপ বিশ্বাসের অনুপস্থিতি—যার সরকারি ব্যাখ্যা গঙ্গাসাগর সফর। তবু প্রতীকী ফাঁক তৈরি হয়।

বিজেপি একসময় টলিউডে এই আধিপত্য ভাঙতে চেয়েছিল। তারকারা এসেছিলেন, ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু ফল ছিল শূন্য। পরে অনেকেই রাজনীতি ছাড়েন বা তৃণমূলে ফেরেন। সেই ফেরার পথেও কোথাও কোথাও পার্থর ভূমিকার কথা শোনা যায়।

সব মিলিয়ে, টালিগঞ্জে এক পাল্টা ‘ভরকেন্দ্র’ তৈরি হচ্ছে কি না—এই প্রশ্ন এখন জোরালো। যদিও পার্থ নিজে বলছেন, “ধুর-ধুর! এ সব নিয়ে আমার একফোঁটা আগ্রহ নেই।”

কিন্তু বাস্তবতা হল—তিনি জানেন, এখনও ইন্ডাস্ট্রির সিংহভাগ অভিনেতা, প্রযোজক ও টেকনিশিয়ানদের ‘বিশ্বাস’ অরূপ–স্বরূপের দিকেই। তবু টালিগঞ্জের ক্ষমতার মানচিত্রে একটি নতুন রেখা যে টানা হচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত