টলিউডের গিল্ডগুলির নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত। ১৭ অগস্টের সরকারি বৈঠকে ঠিক হয়েছে, তালিকা থেকে ‘বেনোজল’ সরিয়েই হবে নির্বাচন। অভিযোগ, গত কয়েক বছরে সিনেমা শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, এমন বহু ব্যক্তিকে বিভিন্ন গিল্ডের সদস্য করা হয়েছিল। এবার বৈধ সদস্যদের চিহ্নিত করে তাঁদের নিয়েই নির্বাচনের পথে হাঁটতে চাইছে প্রশাসন।
‘বেনোজল’ শব্দটি বাঙালির কাছে শুধু আবর্জনা বা বন্যার স্রোতে ভেসে আসা জঞ্জাল নয়। জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি মনে করিয়ে দেয়—বন্যার জলে মূল্যবান কিছু হারিয়েও যেতে পারে। টলিউডের বর্তমান নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সেই ‘বেনোজল’ শব্দটিই যেন হয়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের জমে থাকা বিতর্কের প্রতীক।
সরকারি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, টলিউডের গিল্ডগুলির ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-এর মতো যাচাই প্রক্রিয়া চালানো হবে। লক্ষ্য একটাই—যাঁরা সত্যিই সিনেমা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত এবং গিল্ডের বৈধ সদস্য, তাঁদেরই ভোটার তালিকায় রাখা।
অভিযোগ উঠেছে, তৃণমূলের (TMC) শাসনকালে বিভিন্ন গিল্ডে এমন অনেককে সদস্যপদ দেওয়া হয়েছিল, যাঁদের সঙ্গে সিনেমা পেশার সরাসরি সম্পর্ক নেই। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং গোষ্ঠীগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেই এই ধরনের সদস্যদের টলিউডের বিভিন্ন সংগঠনে ঢোকানো হয়েছিল।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করেই এবার ভোটার তালিকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে কাজটি যে সহজ নয়, তা মেনে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরাও। কারণ বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া সদস্য তালিকা খতিয়ে দেখে কে বৈধ, কে নন—তা নির্ভুল ভাবে পৃথক করতে হবে।
টলিউডের ফিল্ম তৈরির গোটা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২৬টি গিল্ড। সাউন্ড আর্টিস্ট থেকে মেক-আপ আর্টিস্ট, প্রোডাকশন ম্যানেজার থেকে অন্যান্য কারিগরি কর্মী—প্রতিটি পেশার জন্য রয়েছে আলাদা সংগঠন। অভিযোগ, এই ২৬টি গিল্ডের একাধিক সংগঠনেই অনিয়মিত বা বিতর্কিত সদস্য ঢুকে রয়েছেন।
তাই নির্বাচনের আগে প্রথম কাজ হিসেবে সেই সদস্য তালিকাই সংশোধনের দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। বৈধ সদস্যদের তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পরেই ভোটের আয়োজন করা হবে। প্রশাসনের কাছে এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—সংশোধনের নামে যেন প্রকৃত সদস্যরা বাদ না পড়েন, আবার কোনও অবৈধ সদস্যও যাতে ভোটার তালিকায় থেকে না যান।
১৭ অগস্টের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী (Mithun Chakraborty), রুদ্রনীল ঘোষ (Rudranil Ghosh), রূপা গঙ্গোপাধ্যায় (Roopa Ganguly), অভিনেতা জিৎ (Jeet) এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের আধিকারিকেরা। টলিউডের নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করার বিষয়ে বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
নির্বাচন ঘিরে যাতে কোনও রকম অশান্তি না হয়, সেই দাবিও ইতিমধ্যে উঠেছে। গিল্ডের সদস্যদের একাংশ সরকারি আধিকারিকদের পাশাপাশি পুলিশের নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ভোটের দিন ও গণনার সময়ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এদিকে, নির্বাচনের আগে টলিউডে কাজের নিয়মকানুনে কোনও পরিবর্তন না আনার বার্তাও দিয়েছেন রুদ্রনীল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, যত দিন না নির্বাচন হচ্ছে, তত দিন বর্তমানে যে নিয়মে কাজ চলছে, সেই নিয়মই মেনে চলতে হবে কর্মীদের।
সব মিলিয়ে টলিউডের গিল্ড নির্বাচন এখন শুধুই ভোটের আয়োজন নয়, তার আগে ভোটার তালিকা শুদ্ধ করার বড় পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের অভিযোগ, সদস্যপদ নিয়ে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কতটা স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করা যায়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা টলিউড।



