কলকাতার নিউ মার্কেটের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মৃত্যুর পর এবার সামনে আসছে একের পর এক গুরুতর প্রশ্ন। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগে আবাসিক ভবন হিসেবে ব্যবহৃত দু’টি বাড়িকে জুড়ে গত কয়েক বছরে সেখানে বাণিজ্যিক পরিকাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর সেই ভবনের একাধিক তলায় হোটেল ব্যবসা চললেও অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি নির্গমনের মতো মৌলিক ব্যবস্থা আদৌ ছিল কি না, তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।
মঙ্গলবার রাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের নিউ মার্কেট থানা এলাকার ওই ভবনের তৃতীয় তলায় একটি হোটেলে আগুন লাগে। আগুন দ্রুত গোটা ভবনে ছড়িয়ে না পড়লেও অল্প সময়ের মধ্যেই ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় সিঁড়ি ও বিভিন্ন অংশ। প্রায় দু’ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে তৃতীয় তলার হোটেল থেকে উদ্ধার হওয়া ১৫ জনকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ৯ জনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।
নিহতদের মধ্যে ৬ জন পুরুষ, ২ জন মহিলা এবং এক শিশু রয়েছে। প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে তাঁদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। এই ঘটনায় আরও ৬ জন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একইসঙ্গে ভবন থেকে ৬০ জনের বেশি আবাসিককে উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর।
ঘটনার পরই মূল প্রশ্ন উঠেছে ভবনটির কাঠামো এবং ব্যবহার নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর আগেও এই সম্পত্তিগুলি মূলত আবাসিক ভবন ছিল। পরে দু’টি পৃথক বাড়িকে জুড়ে ‘এল’ আকৃতির একটি কাঠামো তৈরি করা হয়। সেই ভবনের তিনটি তলাতেই হোটেল চালানো হচ্ছিল বলে অভিযোগ।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর দাবি, পিছনের দিকে থাকা অন্য ঠিকানার একটি বাড়িকে সামনের বাড়ির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই সংযুক্তিকরণের সময় প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতিতে বাইরে বেরোনোর জন্য পর্যাপ্ত রাস্তা ছিল না বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা আরও বেড়েছে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ওঠা অভিযোগে। আবাসিক এবং স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। বাণিজ্যিক ভবনে জরুরি নির্গমন পথ থাকার নিয়ম থাকলেও এই হোটেলে একটি মাত্র প্রবেশ ও বেরোনোর পথ ছিল বলে অভিযোগ। সেটিও অত্যন্ত সরু হওয়ায় আগুন লাগার পর আতঙ্ক আরও বাড়ে।
আগুন লাগার পর হোটেলের আবাসিকদের অনেকেই বেরোনোর রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলেন না বলে জানিয়েছেন। ঘন ধোঁয়া দ্রুত সিঁড়ি ও করিডর ঢেকে ফেলায় পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কয়েকজন প্রাণ বাঁচাতে শৌচাগারে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে। পরে দমকলকর্মীরা তাঁদের সেখান থেকে উদ্ধার করেন।
এক আবাসিকের কথায়, দমকলকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে না পৌঁছলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত। ঘটনাচক্রে, অগ্নিকাণ্ডের স্থান থেকে খুব কাছেই রয়েছে দমকলের দপ্তর। ফলে এবার আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—দমকল দপ্তরের এত কাছে এমন একটি হোটেল কীভাবে এতদিন ব্যবসা চালাল?
হোটেলগুলির ট্রেড লাইসেন্স, অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র এবং ভবনের ব্যবহার পরিবর্তনের অনুমতি ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, কীভাবে ওই হোটেলগুলি পারমিট ও ট্রেড লাইসেন্স পেল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তদন্তের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতা সন্তোষ পাঠকের অভিযোগ, হোটেলগুলি নিয়ম মেনে তৈরি হয়নি। তাঁর দাবি, ঘরের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য ভবনের কাঠামোয় পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং কোথাও কোথাও পিলার কেটে জায়গা বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্তের পরই নিশ্চিত হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—আবাসিক ভবন থেকে বাণিজ্যিক ব্যবহারে পরিবর্তনের সময় প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না। পাশাপাশি হোটেল চালানোর জন্য দমকলের ছাড়পত্র, পর্যাপ্ত জরুরি নির্গমন পথ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা জরুরি। নিউ মার্কেটের এই অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের প্রাণহানির পর প্রশাসনিক নজরদারি ও অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে সেই প্রশ্নগুলিরই উত্তর খুঁজছে কলকাতা।



