উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের জমি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে। মঙ্গলবার রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ অভিযোগ করেছেন, তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) সরকারের আমলে চা-বাগানের জমি বেআইনি ভাবে হস্তান্তর ও বিক্রি করা হয়েছে এবং সেই লেনদেন থেকে পাওয়া টাকা দলের নির্বাচনী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর এই অভিযোগ ঘিরে উত্তরবঙ্গের চা-বাগান জমি ব্যবহারের বিষয়টি ফের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।
শংকর ঘোষের দাবি, চা-বাগানের জমি কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, কার স্বার্থে জমি হস্তান্তর হয়েছে এবং সেই লেনদেনের অর্থ কোথায় গিয়েছে—সবটাই তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন। তিনি জানিয়েছেন, এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে তদন্তের দাবি জানাবেন। তবে মন্ত্রীর এই অভিযোগের স্বপক্ষে এখনও কোনও তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট বা আদালতের রায় সামনে আসেনি।
বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে কমিশন গঠনের কথা জানিয়েছে রাজ্য সরকার। সেই প্রসঙ্গ টেনে শংকর ঘোষ বলেন, উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের জমি সংক্রান্ত অভিযোগগুলিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
চা-বাগানের জমি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের প্রশ্নে তাঁর আপত্তির কথাও তুলে ধরেন পর্যটনমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, পূর্বতন সরকারের আমলে চা-বাগানের অব্যবহৃত জমির ৩০ শতাংশ পর্যটন ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের অনুমোদনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল বিজেপি। জমির চরিত্র বদল বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাই তিনি তুলে ধরেন।
তবে শুধু অভিযোগের রাজনীতি নয়, চা-বাগানকে পর্যটনের সঙ্গে আরও বেশি করে যুক্ত করার পরিকল্পনাও এদিন সামনে আনেন শংকর। তাঁর বক্তব্য, উত্তরবঙ্গের চা-বাগানগুলিকে শুধু চা উৎপাদনের জায়গা হিসেবে না দেখে পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে চায় রাজ্য সরকার।
পর্যটনমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ও সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে পুরনো চা-বাগানের বাংলোগুলিকে পর্যটকদের থাকার উপযোগী করে তোলা হতে পারে। একইসঙ্গে চা-বাগানের ভিতরে হোম-স্টে তৈরির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই পর্যটন পরিকল্পনায় স্থানীয় বাসিন্দা এবং চা-শ্রমিকদের সরাসরি যুক্ত করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী। তাঁর মতে, পর্যটন শিল্পের আয় যাতে শুধু বড় সংস্থা বা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং চা-বাগান এলাকার সাধারণ মানুষও যাতে তার সুফল পান, সেই ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
শংকর ঘোষ আরও বলেন, চা-বাগানের মূল চরিত্র এবং চা শিল্পের স্বার্থ কোনও ভাবেই নষ্ট করা যাবে না। পর্যটনের প্রসার ঘটাতে গিয়ে চা উৎপাদনের ক্ষেত্র কমে গেলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তাই উন্নয়ন এবং চা শিল্প—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
রাজ্য সরকারের বর্তমান নীতিতে চা-বাগানের ১৫ শতাংশ জমি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব অনুমোদনের কথাও উল্লেখ করেন পর্যটনমন্ত্রী। এই নীতি নিয়ে আগেও রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে। ২০২৪ সালে চা-বাগানের ৩০ শতাংশ জমি পর্যটন ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রস্তাব ঘিরে বিজেপি বিধায়কেরা বিধানসভায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি, চা শিল্প এবং রাজনীতির সঙ্গে চা-বাগানের জমির সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জমি হস্তান্তর নিয়ে শংকর ঘোষের সাম্প্রতিক অভিযোগের পর বিষয়টি প্রশাসনিক তদন্তের দিকে যায় কি না, এখন সেদিকেই নজর। একইসঙ্গে পর্যটনের নামে জমির ব্যবহার বাড়াতে গিয়ে চা শিল্প ও শ্রমিকদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকে, সেটিও আগামী দিনে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।



