তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়ে আইনি লড়াইয়ের মধ্যেই দলীয় তহবিল সংক্রান্ত মামলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের জন্য স্বস্তির নির্দেশ। তহবিল ফ্রিজ থাকা সত্ত্বেও তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে নির্দিষ্ট খরচ চালানোর অনুমতি দিয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court)। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের আদালতের নির্দেশে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে ওই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা যাবে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, অ্যাকাউন্টগুলির টাকা ব্যবহারে সরাসরি অবাধ অনুমতি দেওয়া হয়নি। কালীঘাট তৃণমূলের অনুমোদিত সইকারীদের মধ্যে যে কোনও দু’জন চেকে সই করতে পারবেন। সেই চেক প্রথমে আদালত-নিযুক্ত বিশেষ আধিকারিকের কাছে যাবে। তাঁর অনুমোদনের পরই ব্যাঙ্কে চেকটি পেশ করা যাবে।
অর্থাৎ, অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থের উপর আগের মতোই আদালতের নজরদারি বজায় থাকছে। দৈনন্দিন দলীয় কাজ এবং আইনি খরচের মতো নির্দিষ্ট প্রয়োজনেই টাকা ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বড় ধরনের বা অস্বাভাবিক খরচের ক্ষেত্রে এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার আওতায় অনুমতি নেই।
এই তিনটি অ্যাকাউন্ট নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল তৃণমূলের দুই শিবিরের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পর। বিদ্রোহী শিবিরের কয়েকজন বিধায়ক দলীয় তহবিলের উৎস ও লেনদেন নিয়ে অভিযোগ তুলে তদন্তের আবেদন করেছিলেন। এরপর বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের সাইবার ক্রাইম থানায় এফআইআর হওয়ার পর ১৯ জুন তিনটি অ্যাকাউন্টে ডেবিট ফ্রিজ করা হয়।
তৎকালীন শুনানিতে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের আদালত অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, এফআইআর দায়েরের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অ্যাকাউন্টে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। তবে সেই পর্যায়ে আদালত অভিযোগগুলির সত্যতা নিয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত দেয়নি এবং পুলিশি তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল।
এরপর ৯ জুলাই আদালত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুব্রত তালুকদারকে বিশেষ আধিকারিক হিসেবে নিয়োগ করে তিনটি অ্যাকাউন্টের লেনদেন তদারকির ব্যবস্থা করে। সেই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট দলীয় খরচ ও আইনি ব্যয়ের জন্য টাকা তোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই অনুমতি দিয়ে আদালত তৃণমূলের কোন শিবিরকে ‘আসল’ দল হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) সামনে দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে যে বিরোধ চলছে, তার নিষ্পত্তির সঙ্গে এই আর্থিক ব্যবস্থাকে আলাদা রাখা হয়েছে। কমিশনের সিদ্ধান্তের পরে পরিস্থিতি বদলালে সংশ্লিষ্ট পক্ষ আদালতে ফের আবেদন করতে পারবে।
তবে তৃণমূলের সব অ্যাকাউন্ট এই নির্দেশের আওতায় পড়ছে না। বিশেষ করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (Enforcement Directorate) আলাদা তদন্তে দলের কয়েকটি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। সেই কারণে পুলিশি ফ্রিজ এবং ইডির পদক্ষেপ—দুই আইনি প্রক্রিয়াকে আলাদা করে দেখা জরুরি। সুপ্রিম কোর্টও আগস্টে ইডি-সংক্রান্ত অ্যাকাউন্ট ব্যবহারে কলকাতা হাই কোর্টের বিধিনিষেধে হস্তক্ষেপ করেনি।
এদিকে দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে মমতা শিবিরের পৃথক আইনি লড়াইও চলছে। ২১ সেপ্টেম্বর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা আবেদনের দ্রুত শুনানির আর্জি গ্রহণ করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই বিষয়টি শুনানির চেষ্টা করা হবে।
ফলে একই সময়ে তৃণমূলের সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াই—একদিকে দলের নাম ও প্রতীকের অধিকার, অন্যদিকে দলীয় তহবিল ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিচালনার প্রশ্ন। নতুন আদালত-নির্দেশে আপাতত মমতা শিবিরের দৈনন্দিন আর্থিক কার্যক্রম চালানোর একটি নিয়ন্ত্রিত পথ খোলা থাকল।



