১৫ বছরের শাসনের অবসান। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র কার্যত গেরুয়া রঙে ঢেকে গিয়েছে। ২৯৩টি আসনের মধ্যে বিজেপির ঝুলিতে ২০৭, আর তৃণমূল নেমে এসেছে মাত্র ৮০-তে। কিন্তু সংখ্যার এই বিপর্যয়ের থেকেও বেশি চাঞ্চল্য তৈরি করেছে জেলাভিত্তিক ফলাফল। একাধিক জেলায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়েছে ঘাসফুল শিবির, আবার বহু জেলায় একসময়কার ‘দুর্গ’ এখন কার্যত আইসিইউ-তে। উত্তরবঙ্গ থেকে জঙ্গলমহল, শহর কলকাতা থেকে শিল্পাঞ্চল— প্রায় সর্বত্রই তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে ভয়াবহ ভাঙনের ছবি স্পষ্ট।
উত্তরবঙ্গে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল। আলিপুরদুয়ার, দার্জিলিং এবং জলপাইগুড়িতে একটিও আসন পায়নি তারা। কোচবিহারের ৯টির মধ্যে ৮টি এবং কালিম্পংয়ের একমাত্র আসনও গিয়েছে বিজেপির দখলে। উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিণ দিনাজপুরেও তৃণমূলের আসন কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। মালদহে ১২টির মধ্যে ৬টি আসন ধরে রাখতে পারলেও আগের তুলনায় স্পষ্ট ক্ষয় দেখা গিয়েছে।



সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গিয়েছে মুর্শিদাবাদে। একসময় তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত এই জেলায় ২২টির মধ্যে ২০টি আসন ছিল ঘাসফুলের দখলে। এ বার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৯-এ। বিজেপি বড় অংশ দখল করেছে, পাশাপাশি কংগ্রেস, সিপিএম এবং হুমায়ুন কবীরের এজেইউপিও জায়গা করে নিয়েছে।
নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনায় কার্যত উল্টে গিয়েছে সমীকরণ। নদিয়ার ১৭টির মধ্যে ১৪টি এবং উত্তর ২৪ পরগনার ৩৩টির মধ্যে ২৩টি আসন বিজেপির ঝুলিতে। একসময় যে উত্তর ২৪ পরগনা তৃণমূলের অজেয় দুর্গ ছিল, সেখানে এই ফল রাজনৈতিক মহলে বড় বার্তা দিচ্ছে।



দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তৃণমূল কিছুটা লড়াই ধরে রাখতে পারলেও সেখানেও বিজেপির উত্থান স্পষ্ট। ৩১টির মধ্যে ১৯টি আসন পেয়েছে তৃণমূল, বিজেপি জিতেছে ১০টিতে। ভাঙড়ে নিজের আসন ধরে রেখেছেন আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি। ফলতা কেন্দ্রে এখনও ভোট প্রক্রিয়া বাকি।
কলকাতাতেও বড় ধাক্কা খেয়েছে ঘাসফুল শিবির। ২০২১ সালে শহরের ১১টি আসনই ছিল তৃণমূলের দখলে। এ বার বিজেপি জিতেছে ৬টিতে। ভবানীপুরে পরাজিত হয়েছেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হেরেছেন শশী পাঁজা ও দেবাশিস কুমারের মতো একাধিক হেভিওয়েটও।
হাওড়ায় ১৬টির মধ্যে ৯টি আসন ধরে রাখলেও আগের মতো একচ্ছত্র আধিপত্য আর নেই তৃণমূলের। হুগলিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ— ১৮টির মধ্যে মাত্র ২টি আসন পেয়েছে ঘাসফুল। পূর্ব মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া এবং পশ্চিম বর্ধমানে সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গিয়েছে দল।

জঙ্গলমহলেও কার্যত গেরুয়া ঝড় বইেছে। পশ্চিম মেদিনীপুরে ১৫টির মধ্যে ১৩টি, ঝাড়গ্রামের ৪টির সবক’টি এবং পুরুলিয়ার ৯টির সব আসন বিজেপির দখলে। বাঁকুড়াতেও ১২টির মধ্যে ১১টি আসনে জয় পেয়েছে পদ্মশিবির।
পূর্ব বর্ধমান, যা একসময় তৃণমূলের অটুট ঘাঁটি বলে ধরা হত, সেখানেও বড় ভাঙন। ১৬টির মধ্যে মাত্র ২টি আসন পেয়েছে ঘাসফুল। পশ্চিম বর্ধমানে একটিও আসন জিততে পারেনি তারা। বিজেপির দাবি, মহিলাদের জন্য প্রচারিত ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’ প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি ভোটে বড় প্রভাব ফেলেছে।
অনুব্রত মণ্ডলের জেলা বীরভূমেও আর আগের ছবি নেই। ১১টির মধ্যে ৬টি আসন পেয়েছে বিজেপি। তৃণমূল নেমে এসেছে ৫-এ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মহিলা ও সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরাতে সক্ষম হওয়াতেই বিজেপির এই অভূতপূর্ব উত্থান সম্ভব হয়েছে।







