স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে কয়েক হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে এবার তদন্তকারী সংস্থার সাহায্য চাইছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে এমনই ইঙ্গিত দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, প্রাথমিক তদন্তে বিপুল অঙ্কের দুর্নীতির তথ্য সামনে এসেছে। শুধু নার্সিংহোম বা চিকিৎসক নন, এই অনিয়মে স্বাস্থ্য দফতরের নিচুতলার কর্মী, মধ্যস্থতাকারী সংস্থা, এমনকি কিছু উপভোক্তারও যোগ থাকতে পারে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের গত ১০ বছরের নথি নিয়ে একটি ফাইল তৈরি করেছে দফতর। বিষয়টি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠকের জন্য সময় চেয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর অনুমতি মিললে আর্থিক দুর্নীতির তদন্তে অভিজ্ঞ কোনও সংস্থার হাতে নথি তুলে দেওয়ার কথা ভাবছে স্বাস্থ্য দফতর।
স্বাস্থ্যসাথী দুর্নীতির তদন্তে এবার বিশেষ সংস্থা? মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সময় চাইলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত এবার বিশেষ কোনও তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার কথা ভাবছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, প্রকল্পের গত ১০ বছরের নথি খতিয়ে দেখতে গিয়ে একাধিক স্তরে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। এই দুর্নীতির প্রকৃত ব্যাপ্তি নির্ধারণ করতে স্বাস্থ্য দফতরের নিজস্ব তদন্ত যথেষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠকের জন্য সময় চেয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রীর অনুমতি মিললে স্বাস্থ্যসাথী সংক্রান্ত নথি কোনও আর্থিক দুর্নীতির তদন্তে অভিজ্ঞ সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হবে। তবে এখনও পর্যন্ত তদন্তকারী সংস্থার নাম বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরুর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে কীভাবে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে, তার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষে কঠিন। তাঁর কথায়, এই ধরনের আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত করার মতো পর্যাপ্ত সময় ও বিশেষজ্ঞ দক্ষতা দফতরের নেই। তাই গত ১০ বছরের নথি একটি স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, প্রাথমিক তদন্তে স্বাস্থ্য দফতরের নিচুতলার আধিকারিক থেকে শুরু করে হাসপাতাল, চিকিৎসক, উপভোক্তা এবং রোগীর পরিবারের একাংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও স্বাধীন তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ভুয়ো বিল তৈরির একাধিক অভিযোগ তুলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, মৃত ব্যক্তির স্বাস্থ্যসাথী কার্ড ব্যবহার করে একাধিকবার চিকিৎসার বিল তৈরি করা হয়েছে। এমন ঘটনাও সামনে এসেছে বলে তিনি জানিয়েছেন, যেখানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কোনও উপভোক্তার মৃত্যু হওয়ার কয়েক বছর পরেও তাঁর নামে নতুন করে চিকিৎসার বিল জমা পড়েছে।
শারদ্বতের অভিযোগ, এই ধরনের বিল যাচাই ও অনুমোদনের দায়িত্ব ছিল থার্ড পার্টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বা TPA সংস্থাগুলির। অথচ তাদের একাংশের বিরুদ্ধেই ভুয়ো বিল অনুমোদনে সাহায্য করার অভিযোগ উঠেছে। মৃত ব্যক্তির কার্ড কীভাবে নার্সিংহোমের হাতে পৌঁছল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমের একাংশের বিরুদ্ধে আগে থেকেই অনিয়মের অভিযোগ ছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য দফতর বিভিন্ন সময়ে নির্দেশিকা জারি করেছিল। কিন্তু বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, প্রকল্পের টাকা অনুমোদনের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী TPA সংস্থাগুলির ভূমিকা আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য দফতরের একাংশের অভিযোগ, ভুয়ো উপভোক্তা, চিকিৎসক, রোগী ও হাসপাতালের তথ্য ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে বিল তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। তবে কোন সংস্থা বা ব্যক্তি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত, তা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
স্বাস্থ্যসাথীর পাশাপাশি প্রসূতি মায়েদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য চালু ‘নিশ্চয় যান’ প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, এই প্রকল্পের অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবাতেও ভুয়ো নথি ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, সরকারি প্রকল্পের টাকা কোথায় যাচ্ছে এবং কারা এই অনিয়মে যুক্ত, তা খুঁজে বার করা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এ ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ধরপাকড় চালানো কি স্বাস্থ্য দফতরের একার পক্ষে সম্ভব?
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতরও শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেছেন, কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকলে প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে সেই প্রক্রিয়ায় যেন কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আত্মীয়কে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ঘটনা না ঘটে, সে দিকেও নজর রাখার কথা বলেছেন তিনি।
এখন নজর মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বৈঠকের দিকে। তদন্তকারী সংস্থার হাতে নথি তুলে দেওয়ার অনুমতি মিলবে কি না, এবং তদন্তের পরিধি কতটা বিস্তৃত হবে, তা স্পষ্ট হবে পরবর্তী সিদ্ধান্তের পরেই।



