‘স্বার্থপর’ রিভিউ: সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে আঘাত করল কোয়েল-কৌশিকের অভিনয়

অন্নপূর্ণা বসুর প্রথম ছবি ‘স্বার্থপর’ সমাজের গভীরে গেঁথে থাকা পুরুষতন্ত্রের গোঁড়ামিকে প্রশ্ন করে। অপর্ণা ও সৌরভের গল্পে নারী সম্মানের এক নিঃশব্দ লড়াই।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

বাংলা সিনেমায় নারী-কেন্দ্রিক গল্প আজ আর বিরল নয়, কিন্তু অন্নপূর্ণা বসুর ‘স্বার্থপর’-এর সাহস অন্য স্তরের। পরিচালক তাঁর প্রথম ছবি দিয়েই সমাজের চিরাচরিত পুরুষতান্ত্রিক ভাবনাকে সরাসরি প্রশ্ন করেছেন। ভাইবোনের সম্পত্তি-বিতর্কের আড়ালে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন নারী আত্মসম্মান, ন্যায্যতা এবং আত্মপরিচয়ের লড়াই।

চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে সৌরভ (কৌশিক সেন) ও অপর্ণা (কোয়েল মল্লিক) — দুই ভাইবোন। দাদা সৌরভ, বোনের অনুমতি না নিয়েই পৈতৃক ভিটে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। বোনকে কেবল ‘নো অবজেকশন’ চিঠিতে সই করতে বলা হয়। কিন্তু অপর্ণা সম্পত্তি নয়, নিজের আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই লড়ে। কারণ আজ যদি সে চুপ করে যায়, আগামী প্রজন্মও শিখবে অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা।

এই একফোঁটা প্রতিবাদই ছবির প্রাণ। এক ভাইফোঁটার দিনে সৌরভ ও অপর্ণার মুখোমুখি সংঘর্ষ যেন দুই মানসিকতার টানাপোড়েন। আদালতের দরজায় গিয়ে দাদা-বোনের সম্পর্কের জটিলতা আরও গভীর হয়। অপর্ণার যন্ত্রণা স্পষ্ট— যে বাড়িটিকে সে আশ্রয় ভেবেছিল, সেই বাড়িতেই এখন তাকে নিজের অধিকার অস্বীকার করতে হচ্ছে।

‘স্বার্থপর’ রিভিউ: সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে আঘাত করল কোয়েল-কৌশিকের অভিনয়
‘স্বার্থপর’ রিভিউ: সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে আঘাত করল কোয়েল-কৌশিকের অভিনয়

অন্নপূর্ণা বসুর পরিচালনায় এই গল্প কেবল একটি পারিবারিক বিরোধ নয়; এটি সমাজের প্রতিফলন। এমন সমাজ যেখানে নারীর ‘সমান অংশীদার’ হওয়া এখনও প্রশ্নচিহ্ন। ‘স্বার্থপর’ সেই প্রশ্নকে বড় পর্দায় নিয়ে এসেছে এক নিঃশব্দ প্রতিবাদের রূপে।

ছবির সমান্তরালে দেখা যায় আদালতের ভেতরে ও বাইরে দুই উকিলের দ্বন্দ্ব— বাদী পক্ষের সরখেল (অনির্বাণ চক্রবর্তী) এবং বিবাদী পক্ষের যুধিষ্ঠির (রঞ্জিত মল্লিক)। তাঁদের যুক্তি-প্রতিযুক্তি ছবিতে এনে দিয়েছে এক ধরণের উত্তেজনা ও প্রাণ। বিশেষ করে আদালতের দৃশ্যে রঞ্জিত মল্লিকের দীর্ঘ সংলাপ দর্শকের হাততালি কুড়িয়েছে।

অভিনয়ে কোয়েল মল্লিকের রূপান্তর অনবদ্য। গ্ল্যামারের মোড়ক ছেড়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এক বাস্তব, গৃহস্থ, আত্মসম্মানবোধে দৃঢ় নারী। তাঁর নীরব মুহূর্তগুলো ছবির আবেগ বহন করে। কৌশিক সেন আবারও প্রমাণ করলেন, নেগেটিভ চরিত্রেও কতটা সংযমে অভিনয় করা যায়। তাঁর চোখের এক্সপ্রেশনেই লুকিয়ে থাকে ভাইয়ের ভালোবাসা আর অহংকারের দ্বন্দ্ব।

ইন্দ্রজিৎ চক্রবর্তী অপর্ণার স্বামীর চরিত্রে যথাযথ— যিনি স্ত্রী ও শ্যালকের মধ্যে শান্তির সেতু গড়তে চান, কিন্তু পারেন না। দর্শক সহজেই তাঁর দ্বিধা-অস্বস্তি বুঝতে পারেন।

সিনেমাটোগ্রাফি ও সংগীতও ছবির শক্তি। অনুপ সিংয়ের ক্যামেরা ঘরোয়া আবহকে বাস্তব রূপ দিয়েছে, আর গান— ‘এই শোন, খেলতে যাবি চল’ ও ‘ভেসে যায় সব খেলা একদিন’— গল্পের গতি বাড়িয়েছে। সংলাপে আজকের Gen Z প্রজন্মের ভাষা ও সংবেদনও জায়গা পেয়েছে, যা ছবিটিকে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছে।

সব মিলিয়ে ‘স্বার্থপর’ কেবল পারিবারিক নাটক নয়, বরং নারীর মর্যাদা রক্ষার এক নীরব আন্দোলন। অন্নপূর্ণা বসুর প্রথম ছবিতেই তাঁর সংবেদনশীল পরিচালনা, ভারসাম্যপূর্ণ ছন্দ এবং স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রশংসার যোগ্য। বাংলা সিনেমা পেয়েছে এক প্রতিশ্রুতিশীল নতুন পরিচালক।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন