নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর দলের নেতা-কর্মীদের আচরণ নিয়ে সতর্কবার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার পূর্ব মেদিনীপুরের রেয়াপাড়ায় শহিদ ও আহতদের পরিবারের সম্মানজ্ঞাপন অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, জয় পাওয়ার পর ঔদ্ধত্য বা অহংকার দেখানো চলবে না। তৃণমূল নেতা শেখ সুফিয়ানের বহুচর্চিত ‘জাহাজবাড়ি’র প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দুর বার্তা, বিজেপি নেতাদের চালচলন এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে তাঁদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে।
নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথের জয়ের পর রবিবার সন্ধ্যায় রেয়াপাড়ার অনুষ্ঠানে যোগ দেন শুভেন্দু। উপস্থিত ছিলেন নবনির্বাচিত বিধায়ক হাসিরানি রথ এবং সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামের ভোটারদের ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি দলের নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
শুভেন্দু বলেন, তিনি বর্তমানে ভবানীপুরের বিধায়ক হলেও নন্দীগ্রামের ভোটার হিসেবেই থাকবেন। এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নন্দীগ্রামে রেলপথ ও সেতু নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করার কথা জানান। নন্দীগ্রাম সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবা বাড়ানোর আশ্বাসও দেন তিনি।
এর পরেই দলের নেতা এবং নির্বাচিত পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের আচরণ নিয়ে সতর্ক করেন শুভেন্দু। তাঁর কথায়, “ঔদ্ধত্য চলবে না, আচরণ-চালচলন সংযত রাখবেন। পরে কেউ যাতে না বলেন যে আপনারাও ‘জাহাজবাড়ি’ তৈরি করেছেন।”
নন্দীগ্রামের গোকুলনগরের কাছে অবস্থিত জাহাজের আদলে তৈরি বিশাল বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক আলোচনায় রয়েছে। বাড়িটির মালিক তৃণমূল নেতা শেখ সুফিয়ান। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম জমি আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। একসময় সুফিয়ানের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ছিলেন শুভেন্দুও। পরে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলানোর পর সুফিয়ানের বাড়ি নিয়ে একাধিকবার সরব হয়েছেন শুভেন্দু।
স্থানীয় সূত্রে প্রচলিত বক্তব্য অনুযায়ী, জমি আন্দোলনের সময় সুফিয়ানের বাড়ি ছিল তুলনায় ছোট। ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর তৈরি হয় বিশালাকার বাড়িটি। বাড়ি নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন। তবে বাড়ি তৈরির অর্থের উৎস নিয়ে ওঠা রাজনৈতিক অভিযোগকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে ধরা যায় না।
সম্প্রতি ঋণ পরিশোধ না করার অভিযোগে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ সুফিয়ানের নামে আইনি নোটিস পাঠিয়েছিল বলেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এই বিষয়টি তুলে ধরে সুফিয়ানকে আক্রমণ করেছেন শুভেন্দু। রবিবারও তাঁর নাম না করে সেই ‘জাহাজবাড়ি’র প্রসঙ্গেই বিজেপি নেতাদের সতর্ক করেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দু বলেন, দল ও সংগঠনের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। তাঁর নির্দেশ, “একটা কথা মাথায় রেখে সকলে চলবেন— প্রথমে জনগণকে দেখতে হবে। এবং তার পর কর্মীদের স্বার্থ দেখবেন।” উৎসব-অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে এলাকার প্রয়োজনে পাশে থাকার আশ্বাসও দেন তিনি।
নন্দীগ্রামে নিজের ছেড়ে আসা বিধানসভা কেন্দ্রের পরিষেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও আশ্বাস দিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর কার্যালয় থেকে আগে যে পরিষেবা দেওয়া হত, তা বজায় থাকবে বলে জানান তিনি। এলাকার উন্নয়নে রেলপথ, সেতু ও হাসপাতালের পরিষেবা নিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও ফের তুলে ধরেন।
উপনির্বাচনে জয়ের পর নন্দীগ্রামে বিজেপির নেতা-কর্মীদের জন্য শুভেন্দুর বার্তা স্পষ্ট— মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, পঞ্চায়েত পরিচালনায় সংযত থাকতে হবে এবং ক্ষমতার দম্ভ দেখানো চলবে না। তৃণমূলকে আক্রমণ করতে গিয়ে ‘জাহাজবাড়ি’র উদাহরণ দিলেও সেই প্রসঙ্গেই নিজের দলের নেতাদেরও সতর্ক করে দিলেন তিনি।



