মুকুল রায়ের বিধায়কপদ খারিজ হওয়া নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে যে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছিল, তাতে এবার নতুন মোড় দিল সুপ্রিম কোর্ট। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে মুকুলের বিধায়কপদ বাতিল হওয়ার সিদ্ধান্তে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিল শীর্ষ আদালত। একইসঙ্গে মামলায় বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, অম্বিকা রায় এবং মুকুল রায়—চার জনকেই নোটিস পাঠিয়ে চার সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই স্থগিতাদেশ শুধু আইনি দিক থেকেই নয়—পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
শুক্রবার বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে এই মামলা ওঠে। কলকাতা হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন মুকুল রায়ের পুত্র শুভ্রাংশু রায়। তাঁর আবেদনের ভিত্তিতেই আপাতত হাইকোর্টের নির্দেশ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মুকুলের শারীরিক অবস্থা ও মামলার ‘গ্রহণযোগ্যতা’ নিয়েও প্রশ্ন
সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় শুভ্রাংশুর করা মামলার গ্রহণযোগ্যতা (maintainability) নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কারণ, মুকুল রায় দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ এবং হাসপাতালেও ভর্তি ছিলেন বলে জানা যাচ্ছে। সক্রিয় রাজনীতি থেকে বর্তমানে তিনি অনেকটাই দূরে। এই সমস্ত বিষয় বিবেচনা করেই, আপাতত হাইকোর্টের রায়ে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিল শীর্ষ আদালত।
কৃষ্ণনগর উত্তরে বিজেপির টিকিটে জিতেও তৃণমূলে যোগ—বিতর্কের সূত্রপাত
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে লড়েছিলেন মুকুল রায়। জিতে বিধায়কও হন তিনি। কিন্তু পরে তিনি বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন। তবু বিধায়কপদ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা দেননি। ফলে রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলে থাকলেও, নথিপত্রে তিনি বিজেপি বিধায়ক হিসেবেই থেকে যান—এটাই তৈরি করে জটিলতা।
এই বিষয়টি সামনে আসতেই বিজেপির পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে অভিযোগ জানানো হয়। তখন স্পিকার জানিয়েছিলেন, মুকুল এখনও বিজেপিতেই আছেন—তাই তাঁর বিধায়কপদ খারিজ করার সুযোগ নেই।
পিএসি চেয়ারম্যান করা নিয়েও তীব্র বিতর্ক
এই বিতর্ক আরও বাড়ে যখন মুকুলকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (PAC) চেয়ারম্যান করা হয়। সাধারণ নিয়মে এই পদে বিরোধী দলের কোনও সদস্য বসেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পরেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে—তাহলে মুকুলকে সরকার পক্ষ নাকি বিরোধী পক্ষ ধরা হচ্ছে?
এই প্রেক্ষাপটেই মুকুলের বিরুদ্ধে দলত্যাগ বিরোধী আইন প্রয়োগ করে বিধায়কপদ খারিজের দাবি তুলে মামলা করেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
হাইকোর্ট কী বলেছিল? কেন বিধায়কপদ বাতিল হয়েছিল?
গত ১৩ নভেম্বর কলকাতা হাইকোর্ট দলত্যাগ বিরোধী আইনের ভিত্তিতে মুকুল রায়ের বিধায়কপদ খারিজ করার নির্দেশ দেয়। তবে সেই রায় ঘিরে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়—
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পদ আদালত খারিজ করতে পারে কি না?
কারণ, নিয়ম অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মূলত থাকে বিধানসভার স্পিকারের হাতে।
মুকুলের মামলায় স্পিকার আদালতে জানিয়েছিলেন, দলত্যাগ নিয়ে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত নন। সেই কারণে তিনি বিধায়কপদ খারিজ করতে পারছেন না। কিন্তু দীর্ঘদিন সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকায় হাইকোর্ট স্পিকারের অবস্থানকে খারিজ করে দেয় এবং মুকুলের বিধায়কপদও বাতিল করে।
শুভ্রাংশু রায়ের আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ
মুকুল রায়ের পুত্র শুভ্রাংশু রায় বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসে রয়েছেন। বাবার সঙ্গেই তিনিও বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। কলকাতা হাইকোর্ট মুকুলের বিধায়কপদ বাতিল করে দেওয়ার পর শুভ্রাংশু সেই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন।
শুক্রবার সেই মামলাতেই সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের নির্দেশে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিল। পাশাপাশি মামলার চার গুরুত্বপূর্ণ পক্ষকে নোটিস দিয়ে হলফনামা জমা দিতে বলেছে আদালত।
এখন নজর থাকবে—পরবর্তী শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট কীভাবে স্পিকার বনাম আদালতের ক্ষমতা, দলত্যাগ বিরোধী আইন এবং জনপ্রতিনিধির সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ দেয়।








