ঝাড়খণ্ডে কাজ করতে গিয়ে মুর্শিদাবাদের এক পরিযায়ী শ্রমিকের রহস্যমৃত্যু ঘিরে তীব্র উত্তেজনা ছড়াল বেলডাঙায়। যুবকের দেহ গ্রামে ফিরতেই কার্যত বিস্ফোরণ ঘটেছে জনরোষে—১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ, টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ, বেলডাঙা স্টেশন আটকে ট্রেন চলাচল বন্ধ। সকাল থেকেই অবরোধের জেরে জাতীয় সড়কে যানজট, ট্রেনে আটকে পড়া যাত্রীদের ভোগান্তি এবং এলাকায় টানটান উত্তেজনা—সব মিলিয়ে বেলডাঙা যেন রণক্ষেত্রে পরিণত।
মৃত শ্রমিকের নাম আলাউদ্দিন শেখ (৩০)। তিনি বেলডাঙার সুজাপুর কুমারপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা। পরিবার সূত্রে জানা যাচ্ছে, ঝাড়খণ্ডে তিনি ফেরিওয়ালার কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছতেই সন্দেহ দানা বাঁধে। স্থানীয়দের দাবি, ওই যুবকের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হলেও ঘটনাটি আত্মহত্যা নয়—পিটিয়ে খুন করার পর দেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, আলাউদ্দিনকে দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাতেই পথে নামেন তাঁরা। পরিবারের আরও অভিযোগ, তিনি মুর্শিদাবাদের শ্রমিক হওয়ায় টার্গেট করা হয়েছে।
দেহ গ্রামে ফিরতেই উত্তেজনা চরমে, জাতীয় সড়ক অবরোধ
শুক্রবার আলাউদ্দিনের দেহ গ্রামে ফেরার পর পরিস্থিতি দ্রুত হাতের বাইরে চলে যায়। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা আটকে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে বেলডাঙা স্টেশনও অবরোধ করা হয়, যার জেরে শিয়ালদহ-লালগোলা শাখায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
জাতীয় সড়ক আটকে থাকায় উত্তরবঙ্গ ও কলকাতাগামী গাড়ির গতি স্তব্ধ হয়ে পড়ে। সকাল থেকে বহু যাত্রী রাস্তায় আটকে রয়েছেন, ট্রেনও আটকে পড়েছে একাধিক জায়গায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশবাহিনী। তবুও অবরোধ সম্পূর্ণ ওঠেনি বলে খবর।
মায়ের কান্না: “ছেলে বলেছিল ভয় পাচ্ছে… ওরা খুন করে ঝুলিয়ে দিয়েছে!”
পরিবারের দাবি, বুধবার দুপুরে শেষবার বাড়িতে ফোন করেছিলেন আলাউদ্দিন। তিনি কথা বলেছিলেন মায়ের সঙ্গে। মৃতের মা সোনা বিবি কান্নাভেজা গলায় বলেন,
“ছেলে ফোনে বলেছিল যেখানে আছে, অবস্থা ভাল নয়। খুব ভয়ে ভয়ে ছিল। ঘর থেকে বেরোতে পারছিল না। বলেছিল সুযোগ পেলেই বাড়ি ফিরবে। বুধবার দুপুর ২টোয় শেষবার কথা হয়েছিল… তারপর আর ফোন ধরেনি। ওরা ওকে খুন করে ঝুলিয়ে দিল!”
পরিবারের অভিযোগ, যুবককে পরিকল্পিতভাবেই হত্যা করা হয়েছে এবং পরে ঘটনাকে আত্মহত্যার রূপ দিতে দেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাজনীতি নিয়েও বিস্ফোরণ: তৃণমূল-বিজেপি—দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই ক্ষোভ
বিক্ষোভকারীদের একাংশ তৃণমূল ও বিজেপি—দুই দলের বিরুদ্ধেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। এক বিক্ষোভকারীর দাবি,
“ওকে আইকার্ড দেখাতে বলেছিল। সেখানে মুর্শিদাবাদের ঠিকানা দেখেই পিটিয়ে মারা হয়েছে। বাইরে কাজ করতে গেলেই কেন মুর্শিদাবাদের মানুষ এভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন? আমরা কি ভারতের অংশ নই? দোষীদের ফাঁসি চাই!”
আর এক বিক্ষোভকারীর বক্তব্য আরও কড়া,
“মুখ্যমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস না দিলে অবরোধ তুলব না। আমার দেশেই আমরা নিরাপদ নই? এত সহজে এটা মেনে নেব কেন?”
অধীর চৌধুরীর দাবি: “বাইরে গেলেই বাংলাদেশি বলা হচ্ছে”
দিনের দিকে মৃতের বাড়িতে যান প্রাক্তন সাংসদ ও কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী। তিনি বলেন,
“আমার জেলায় বহু পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করেন। কেউ চুরি-ডাকাতি করেন না। বাইরে গেলেই বাংলাদেশি বলা হচ্ছে… কেন তাঁদের পরিচয়পত্র দেওয়া হচ্ছে না?”
শুভেন্দুর কড়া বার্তা: পুলিশকে পদক্ষেপের অনুরোধ
এদিকে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবি তুলে রাজ্য পুলিশের কাছে আবেদন করেছেন। তিনি সমাজমাধ্যমে লেখেন, জাতীয় সড়ক দীর্ঘক্ষণ অবরুদ্ধ রয়েছে, ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয়েছে এবং এলাকায় পাথর ছোড়ার অভিযোগও উঠেছে। তাঁর দাবি,
“গোটা এলাকায় গুণ্ডাদের আধিপত্য। এখনও পুলিশ কিছু করেনি। বহু যাত্রী আটকে পড়েছেন। আমি রাজ্যের ডিজিকে পদক্ষেপের অনুরোধ করছি।”
এখন নজর তদন্তে—খুন নাকি আত্মহত্যা?
গ্রামের দাবি—এটি খুন। প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী এবং অভিযোগ অনুযায়ী যদি সত্যিই মারধর করে হত্যা করা হয়ে থাকে, তাহলে দোষীদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হবে কি না।
অন্যদিকে অবরোধের জেরে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে প্রতিদিন। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বেলডাঙা জুড়ে।



