তৃণমূলের ২০ ‘বিদ্রোহী’ সাংসদের দলবদল এবং তাঁদের সাংসদপদ খারিজের দাবি নিয়ে দায়ের করা মামলায় বড় পদক্ষেপ করল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) আবেদনের ভিত্তিতে মঙ্গলবার সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় (Sudip Bandyopadhyay), কাকলি ঘোষ দস্তিদার (Kakoli Ghosh Dastidar)-সহ ২০ সাংসদকে নোটিস পাঠিয়েছে শীর্ষ আদালত। তাঁদের প্রত্যেককে নিজেদের বক্তব্য জানাতে হবে।
মামলাটি মূলত লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার (Om Birla) কাছে তৃণমূলের দায়ের করা দলত্যাগ-বিরোধী আইনের আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তি চেয়ে। অভিষেকের অভিযোগ, ২০ সাংসদের বিরুদ্ধে সাংসদপদ খারিজের আবেদন করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সেই বিলম্বের বিরুদ্ধেই সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Surya Kant), বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Joymalya Bagchi) এবং বিচারপতি ভি মোহনা (V Mohana)-র বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। শুনানিতে কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা (Tushar Mehta) জানান, লোকসভার স্পিকার ইতিমধ্যেই ওই ২০ সাংসদকে নোটিস দিয়েছেন। এরপর শীর্ষ আদালতও সংশ্লিষ্ট সাংসদদের বক্তব্য জানতে নোটিস জারি করে।
তবে শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেন। তাঁর বক্তব্য, শুধু নোটিস জারি করাই মূল বিষয় নয়; নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করাটাই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, ২০ সাংসদের জবাব নেওয়ার পর বিষয়টি যাতে অনির্দিষ্টকাল ঝুলে না থাকে, সেই দিকেই আদালতের নজর রয়েছে।
তৃণমূলের অভিযোগ, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর দলের টিকিটে নির্বাচিত ২০ জন লোকসভা সাংসদ দল ছেড়ে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (NCPI)-র সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তৃণমূলের দাবি, তাঁরা যে দলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল ছেড়ে অন্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী দলত্যাগ-বিরোধী আইন প্রয়োগ করা উচিত।
এই ২০ সাংসদের তালিকায় রয়েছেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায় (Satabdi Roy), প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় (Prasun Banerjee), রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় (Rachana Banerjee), সায়নী ঘোষ (Sayani Ghosh), পার্থ ভৌমিক (Partha Bhowmick), জুন মালিয়া (June Maliah)-সহ আরও অনেকে। সুপ্রিম কোর্টের নোটিসের ফলে প্রত্যেককেই এখন মামলায় নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে।
এই মামলা নিয়ে এর আগে একাধিক বার লোকসভার স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য ছিল, ২০ সাংসদ প্রকাশ্যে নিজেদের অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করছেন, অথচ সংসদে তাঁদের নামের পাশে এখনও ‘এআইটিসি’ লেখা রয়েছে। এই পরিস্থিতির দ্রুত নিষ্পত্তি চেয়েই স্পিকারের কাছে আবেদন করা হয়েছিল বলে তৃণমূলের দাবি।
অন্য দিকে, বিদ্রোহী শিবিরের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার আগে দাবি করেছিলেন, সাংসদদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা লোকসভার স্পিকারের। তাঁর বক্তব্য ছিল, স্পিকারের বিষয়টিতে অন্য কোনও পক্ষের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। তবে মঙ্গলবারের শুনানির পর বিষয়টি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন হয়ে গেল।
মামলায় তৃণমূলের হয়ে সওয়াল করছেন সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee)। অন্য দিকে, স্পিকার ও লোকসভার সেক্রেটারি জেনারেলের হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে বক্তব্য রাখেন। আদালত অবশ্য এই পর্যায়ে লোকসভার স্পিকারকে আলাদা করে নোটিস জারি করেনি।
ফলে এখন নজর ২০ সাংসদের জবাবের দিকে। তাঁদের বক্তব্য পাওয়ার পর দলত্যাগ-বিরোধী আইনের আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট কী নির্দেশ দেয়, সেটাই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আপাতত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামলায় সুদীপ-কাকলিদের নোটিস যাওয়ায় তৃণমূলের অন্দরের দলবদল বিতর্ক নতুন করে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এল। মামলার পরবর্তী শুনানি দু’সপ্তাহ পরে।



