চার মাসের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ডিএ মামলা নিয়ে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করতে চলেছে সুপ্রিম কোর্ট। আগামীকাল সুপ্রিম কোর্টের ১১ নম্বর এজলাসে বিচারপতি সঞ্জয় কারোলের বেঞ্চ রাজ্য সরকারি কর্মীদের বহু প্রতীক্ষিত মহার্ঘ ভাতা (Dearness Allowance) মামলার রায় প্রকাশ করবে। কেন্দ্রীয় হারে ডিএ পাওয়ার দাবিতে শুরু হওয়া এই মামলার দিকে তাকিয়ে রয়েছে লক্ষ লক্ষ রাজ্য সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগী। আর্থিক সঙ্কটের যুক্তি বনাম কর্মীদের অধিকার—এই দ্বন্দ্বে কোন পথে হাঁটে শীর্ষ আদালত, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর ডিএ মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। এরপর চার মাসেরও বেশি সময় কেটে যায় রায় ঘোষণার অপেক্ষায়। তার আগেই রাজ্য সরকারকে বকেয়া ডিএ-র অন্তত ২৫ শতাংশ মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই নির্দেশ কার্যকর করার জন্য রাজ্যকে ছ’সপ্তাহ সময়ও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে রাজ্য সরকার কর্মীদের ডিএ দিতে পারেনি।


পরবর্তীতে রাজ্য সরকার আদালতের কাছে আরও ছ’মাস সময় চেয়ে আবেদন জানায়। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই গত ৪ অগস্ট থেকে ৭ অগস্ট টানা চার দিন ধরে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি চলে বিচারপতি সঞ্জয় কারোল ও বিচারপতি মিশ্রের বেঞ্চে। তবে ১২ অগস্ট মামলার শুনানি পিছিয়ে যায়। সূত্রের খবর, ওই দিন রাজ্যের আইনজীবী কপিল সিব্বল বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা (SIR) সংক্রান্ত অন্য মামলায় ব্যস্ত ছিলেন। এরপর একাধিকবার শুনানি পিছিয়ে যাওয়ায় চূড়ান্ত রায় আরও বিলম্বিত হয়।
এই ডিএ মামলা শুরু হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মীদের সমান হারে রাজ্য সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার দাবিতে। বিষয়টি প্রথমে ওঠে স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল (SAT)-এ। সেখান থেকে কলকাতা হাই কোর্ট হয়ে শেষ পর্যন্ত মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। ২০২২ সালে কলকাতা হাই কোর্ট রাজ্য সরকারি কর্মীদের পক্ষে রায় দিয়ে স্পষ্ট জানায়, ডিএ কোনও দয়া নয়—এটি কর্মীদের অধিকার। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কেন্দ্রীয় হারে ডিএ পাওয়ার যোগ্যতা রাজ্য সরকারি কর্মীদেরও রয়েছে।
তবে সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করেই রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। শীর্ষ আদালত অন্তর্বর্তী নির্দেশে রাজ্যকে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ মেটানোর নির্দেশ দিলেও, রাজ্য সরকার আর্থিক সঙ্কটের যুক্তি তুলে ধরে আরও সময় চায়। এমনকি অন্তর্বর্তী নির্দেশ পুনর্বিবেচনারও আবেদন জানানো হয়।


রাজ্যের তরফে যুক্তি দেওয়া হয়, মহার্ঘ ভাতা কোনও মৌলিক অধিকার নয় এবং এটি বাধ্যতামূলকও নয়। কেন্দ্র ও রাজ্যের আর্থিক পরিকাঠামো সম্পূর্ণ আলাদা—তাই কেন্দ্র যে হারে ডিএ দেয়, তার সঙ্গে রাজ্যের তুলনা চলে না। রাজ্যের দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেটেও বকেয়া ডিএ-র জন্য কোনও আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়নি।
অন্য দিকে, মামলাকারী কর্মী সংগঠনগুলির বক্তব্য, নির্দিষ্ট সময় অন্তর ডিএ দেওয়া সরকারি নীতিরই অংশ। খেয়ালখুশিমতো ডিএ নির্ধারণ করা যায় না। বেতন কমিশনের সুপারিশ মেনে চলতে সরকার বাধ্য। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে কিস্তিতে বকেয়া ডিএ মেটানোর প্রস্তাবও দেন মামলাকারীরা।
এখন সব নজর সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দিকে। এই রায় শুধুমাত্র রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য নয়, ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য রাজ্যের কর্মীদের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। আগামীকাল সকাল সাড়ে ১০ টা থেকে রাজ্যের সমস্ত সরকারি কর্মীদের নজরে বন্দি থাকবে সুপ্রিম কোর্টের ১১ নম্বর এজলাস।







