নজরবন্দি ব্যুরো: শনিবার প্রায় ১০ ঘণ্টার ম্যারাথন জেরার পর রবিবারও ভবানী ভবনে হাজির হলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) ব্যক্তিগত সহকারী সুমিত রায় (Sumit Roy)। পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি জমি দুর্নীতি মামলায় তদন্তে সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)। সেই নির্দেশ মেনেই পরপর দু’দিন সিআইডির (CID) মুখোমুখি হলেন তিনি।
রবিবার সকাল ১০টার মধ্যে ভবানী ভবনে পৌঁছনোর নির্দেশ ছিল সুমিতের। নির্ধারিত সময়ের কিছুটা আগেই সিআইডি দফতরে পৌঁছে যান তিনি। শনিবারের মতো এ দিনও তাঁর বয়ান এবং জমি সংক্রান্ত অভিযোগের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তদন্তকারী সূত্রে খবর।
শনিবার প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ ভবানী ভবন থেকে বেরিয়ে সোজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ির দিকে রওনা হন সুমিত। সেই দিনই তাঁকে পরের দিন ফের হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
সুমিতের এই হাজিরার নেপথ্যে রয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি এলাকার জমি সংক্রান্ত মামলা। ওই মামলায় গ্রেফতারি এড়াতে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। ১৫ জুন মেদিনীপুরের একটি আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। পরে তাঁর বিরুদ্ধে লুকআউট সার্কুলারও জারি করা হয়।
এর পর আইনি পথে স্বস্তি পান সুমিত। ৭ অগস্ট সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে শালবনি জমি মামলায় এক সপ্তাহের অন্তর্বর্তী জামিন দেয়। তবে সেই সুরক্ষার সঙ্গে স্পষ্ট শর্তও জুড়ে দেয় শীর্ষ আদালত—তদন্তে ব্যক্তিগত ভাবে সহযোগিতা করতে হবে এবং তদন্তকারীদের সামনে হাজির হতে হবে। জেরার সময় তাঁর সঙ্গে আইনজীবী বা অন্য কোনও ব্যক্তি থাকতে পারবেন না বলেও নির্দেশ দেওয়া হয়।
শীর্ষ আদালতের সেই নির্দেশের পরই শনিবার ভবানী ভবনে প্রথম হাজিরা দেন সুমিত। প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তকারীরা জমি সংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি মামলার নথি, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়গুলি খতিয়ে দেখছেন বলে সূত্রের খবর।
সুমিতের নাম প্রকাশ্যে আসে মূলত প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরাকে (Sujoy Hazra) গ্রেফতারের পর। শালবনি জমি সংক্রান্ত অভিযোগে তদন্তের সময় তাঁর নাম উঠে আসে বলে পুলিশ সূত্রে দাবি। তদন্তকারীরা সুমিতের সঙ্গে হাজরার কথিত যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়ও খতিয়ে দেখছেন।
এখানেই শেষ নয়। সুমিতের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগও সামনে এসেছে। জুনে পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরা থানায় প্রতারণা ও জালিয়াতির একটি FIR দায়ের হয়। সেখানে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই মামলাতেও সুমিতের নাম রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
জুনে সুমিতকে খুঁজতে অভিষেকের কালীঘাটের বাড়িতেও পুলিশ অভিযান চালিয়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি ছিল, তাঁর মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন ওই বাড়ির দিকে পাওয়া গিয়েছিল। দীর্ঘ তল্লাশির পরেও সুমিতকে সেখানে পাওয়া যায়নি এবং কোনও সামগ্রী বাজেয়াপ্ত হয়নি বলে পুলিশি নথিতে উল্লেখ করা হয়।
এই ঘটনার পরই সুমিতের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং লুকআউট নোটিস জারি হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। পরে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন। ৭ অগস্ট সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী সুরক্ষা পাওয়ার পরই অবশ্য তদন্তকারীদের সামনে হাজির হওয়ার পথ খুলে যায়।
বর্তমানে সুমিতের বিরুদ্ধে একাধিক FIR রয়েছে। ৭ অগস্ট কলকাতা হাই কোর্টও (Calcutta High Court) তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া চারটি FIR নিয়ে জরুরি শুনানির আবেদন গ্রহণ করেনি। ফলে পৃথক মামলাগুলির আইনি লড়াইও চলবে।
রাজনৈতিক চাপানউতোরও অবশ্য থামেনি। বিরোধীদের তরফে সুমিতকে ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে সেই সমস্ত রাজনৈতিক অভিযোগের সত্যতা এখনও আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে তদন্তে উঠে আসা তথ্য এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
টানা দু’দিন সিআইডির জেরায় সুমিত রায়ের কাছ থেকে কী তথ্য পাওয়া গেল, তা এখনও প্রকাশ্যে জানায়নি তদন্তকারী সংস্থা। তবে শীর্ষ আদালতের সুরক্ষা নিয়ে ভবানী ভবনে তাঁর পরপর হাজিরা এবং একাধিক মামলায় তাঁর নাম উঠে আসা—দুই ঘটনাতেই শালবনি জমি মামলা নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। তদন্ত কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর।



