এসআইআর (SIR) বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে নাম বাদ পড়লেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব খারিজ হয়ে যায় না—মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)। ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া ব্যক্তিদের আবেদন এবং ট্রাইব্যুনালে সেই সংক্রান্ত মামলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে আদালত। একই সঙ্গে আদালতের পর্যবেক্ষণ, শুধু ভোটার তালিকায় নাম না থাকার কারণে কাউকে নাগরিকত্বের প্রশ্নে চূড়ান্ত ভাবে বিদেশি বলে ধরে নেওয়া যায় না।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় বহু ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাদ যাওয়া অনেক বাসিন্দার দাবি, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় বসবাস করছেন এবং তাঁদের কাছে বৈধ নথিও রয়েছে। নাম বাদ যাওয়ার পর নাগরিকত্ব নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালতের নজরেও আসে। এই পরিস্থিতিতে বাদ পড়া নাম পুনরায় তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য ট্রাইব্যুনালের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে জমা পড়া আবেদনের সংখ্যা এবং তার নিষ্পত্তির হার নিয়েই এ দিন বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে শীর্ষ আদালত। নির্বাচন কমিশনকে হলফনামা দিয়ে জানাতে বলা হয়েছে, এখনও কতগুলি আবেদন বিচারাধীন, কতগুলি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে এবং আবেদনকারীরা কী ধরনের প্রতিকার চেয়েছিলেন। বাদ যাওয়া ভোটারদের করা আবেদন এবং অন্য পক্ষের তরফে নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে করা আবেদনের হিসাব আলাদা করে দেওয়ার কথাও আদালত বলেছে।
এই পর্যবেক্ষণের তাৎপর্য নাগরিকত্বের প্রশ্নেই সবচেয়ে বেশি। ২৭ মে ২০২৬-এর রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছিল, ভোটার তালিকায় নাম রাখার যোগ্যতা যাচাই করতে নির্বাচন কমিশন সীমিত ভাবে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয় পরীক্ষা করতে পারে। কিন্তু সেই পরীক্ষা নাগরিকত্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। কমিশনের সিদ্ধান্ত মূলত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে।
আদালতের সেই রায় অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তিকে ভোটার তালিকায় রাখার ক্ষেত্রে কমিশন সন্তুষ্ট না হলে নাগরিকত্বের প্রশ্নটি সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনাকে নাগরিকত্ব খারিজের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরা যাবে না। অর্থাৎ, ভোটার তালিকার একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নাগরিকত্ব নির্ধারণ—দুই বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
এই কারণেই এসআইআরে নাম বাদ যাওয়া ব্যক্তিদের সরকারি পরিষেবা বা প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত শুধুমাত্র ভোটার তালিকায় নাম নেই বলে তাঁকে স্বয়ংক্রিয় ভাবে সরকারি প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার প্রশ্নে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে খাদ্যসুরক্ষা বা জনকল্যাণমূলক পরিষেবার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর।
এর আগে এসআইআর-সংক্রান্ত শুনানিতেও বাদ যাওয়া ভোটারদের সরকারি পরিষেবা, বিশেষ করে পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (PDS) সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। আদালত ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হওয়া এবং বিচারাধীন মামলার সংখ্যা জানতে চেয়েছিল।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—ভোটার তালিকায় নাম থাকা মানেই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, আবার এসআইআরে নাম বাদ পড়াও নাগরিকত্ব হারানোর চূড়ান্ত ঘোষণা নয়। সুপ্রিম কোর্টের আগের রায়েও এই পার্থক্য স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রশ্ন নির্ধারণের জন্য আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
ফলে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এ বাদ পড়া বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে এখন নজর থাকবে ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী রিপোর্টের দিকে। কতজনের আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে, কতজনের নাম ফের তালিকায় ফিরেছে এবং কতগুলি মামলা এখনও বিচারাধীন—এই তথ্য সামনে এলে পরিস্থিতির প্রকৃত ছবি আরও স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে নাগরিকত্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত শুধু এসআইআরে নাম বাদ যাওয়ার ভিত্তিতে কাউকে নাগরিকত্বহীন বা বিদেশি হিসেবে গণ্য করা যায় না—সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে সেই বিষয়টিই ফের স্পষ্ট হল।



