নেপালে হড়পা বানের পর ১০ দিন কেটে গেলেও এখনও কোনও সন্ধান মেলেনি শর্মিষ্ঠা রায় ভৌমিকের। ২১ অগস্ট ৩২ জনের দলের সঙ্গে নেপালে গিয়েছিলেন তিনি। হড়পা বানের পর আচমকাই পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কাঁচরাপাড়ার ঘটক রোডের বাড়িতে এখন একটাই অপেক্ষা—কবে সুস্থ শরীরে ফিরে আসবেন শর্মিষ্ঠা।
বাড়ির পরিবেশ বাইরে থেকে আগের মতোই। রাজনৈতিক পরিবারের বাড়িতে মানুষের আনাগোনাও রয়েছে। কিন্তু ঘরের ভিতরের ছবিটা বদলে গিয়েছে অনেকটাই। দুই সন্তানকে ঘিরে যে ব্যস্ততা প্রতিদিন সামলাতেন শর্মিষ্ঠা, তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই জায়গাটাই যেন ফাঁকা হয়ে রয়েছে।
মায়ের জন্য সবচেয়ে বেশি অস্থির দশ বছরের ছেলে। বারবার দিদির কাছে মায়ের কথা জানতে চাইছে সে। কিছুক্ষণ পরেই একই প্রশ্ন নিয়ে বাবার কাছে ছুটে যাচ্ছে—‘মায়ের কোনও খবর পাওয়া গেল?’ কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো কোনও খবরই এখনও পরিবারের হাতে নেই।
একাদশ শ্রেণির ছাত্রী, বছর ষোলোর মেয়েটিও পরিস্থিতি বুঝে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে। ছোট ভাইকে সামলাচ্ছে সে। কিন্তু মায়ের ফেরার অপেক্ষায় থাকা ভাইয়ের প্রশ্নের সামনে তাকেও বারবার অসহায় হয়ে পড়তে হচ্ছে।
মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর বেলঘরিয়ার বাড়ি ছেড়ে কাঁচরাপাড়ায় চলে এসেছেন শর্মিষ্ঠার বৃদ্ধা মা। মায়ের অনুপস্থিতিতে দুই সন্তানকে আগলে রেখেছেন স্বামী শুভ্রাংশু রায় এবং শর্মিষ্ঠার মা। পরিবারের পাশে রয়েছেন মেদিনীপুরের রীনা দে-ও। ছোটবেলা থেকেই তিনি মুকুল রায়ের বাড়ির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে দুই সন্তানের দেখভালে সাহায্য করছেন।
রাজনৈতিক পরিবারে বিয়ে হলেও রাজনীতির ব্যস্ততা বা ভিড়ভাট্টার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল না শর্মিষ্ঠার। তাঁর শ্বশুর প্রয়াত মুকুল রায় ছিলেন বঙ্গ রাজনীতির পরিচিত মুখ এবং প্রাক্তন রেলমন্ত্রী। স্বামী শুভ্রাংশু রায়ও বীজপুরের প্রাক্তন বিধায়ক। ফলে বাড়িতে রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের যাতায়াত থাকলেও নিজের জগৎ নিয়েই থাকতে বেশি পছন্দ করতেন শর্মিষ্ঠা।
সংসারের দায়িত্বের বড় অংশও সামলাতেন তিনি। দুই সন্তানের স্কুল, পড়াশোনা, কোচিং—সবকিছুর পাশাপাশি মেয়েকে নাচের স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসার দায়িত্বও ছিল তাঁর। পরিবারের ব্যবসার কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল শর্মিষ্ঠার। তাঁদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, পলিক্লিনিক এবং চক্ষু পরীক্ষা কেন্দ্রের দেখভাল মূলত তিনিই করতেন।
শর্মিষ্ঠার সঙ্গে শুভ্রাংশুর পরিচয় হয়েছিল কল্যাণীর একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার সময়। সেই পরিচয় পরে প্রেমের সম্পর্কে গড়ায়। ২০০৯ সাল নাগাদ তাঁদের বিয়ে হয়। বর্তমানে তাঁদের দুই সন্তান ব্যান্ডেলের একটি বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করছে।
ভ্রমণ করতে ভালোবাসতেন শর্মিষ্ঠা। ব্যস্ত সংসার ও ব্যবসার দায়িত্বের মধ্যেও কখনও একা, কখনও সন্তানদের সঙ্গে, আবার কখনও পরিজনদের নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন তিনি। প্রায় দেড় বছর আগে দুই সন্তানকে নিয়ে লাদাখও ঘুরে এসেছিলেন। নেপাল সফর শেষ করে পুজোর ছুটিতে সন্তানদের নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তাঁর।
কিন্তু সেই পরিকল্পনা এখন থমকে রয়েছে। ২১ অগস্ট নেপালের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর প্রথম কয়েকদিন নিয়মিত স্বামী, সন্তান এবং মায়ের সঙ্গে ফোন ও ভিডিয়ো কলে কথা বলেছেন শর্মিষ্ঠা। তারপর হড়পা বানের পর থেকেই নিখোঁজ তিনি। ১০ দিন পেরিয়েও কোনও খবর না আসায় উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে রায় পরিবারের। এখন পরিবারের সকলের একটাই প্রার্থনা—সব আশঙ্কা কাটিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরুন শর্মিষ্ঠা।



