রোহিত শর্মা (Rohit Sharma)-কে ঘিরে ভারতীয় ক্রিকেটে বিতর্ক যেন থামছেই না। ২০২৭ সালের একদিনের বিশ্বকাপের পরিকল্পনায় তাঁর জায়গা নিয়ে যখন জল্পনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৩৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে ফের আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন ‘হিটম্যান’। ৩৯ বছর বয়সেও এমন পারফরম্যান্সের পর প্রশ্ন উঠছে—ফর্মের বিচারে যদি রোহিত এখনও দলের অন্যতম সেরা ব্যাটার হন, তা হলে ২০২৭ বিশ্বকাপের আগে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে এত আলোচনা কেন?
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে রোহিতের ব্যাট থেকে এসেছিল ১১ ও ২৬ রান। তার পরেই বাড়ে জল্পনা, লর্ডসে তৃতীয় একদিনের ম্যাচটি হয়তো ভারতীয় জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচ হতে পারে। এমন রিপোর্টও সামনে এসেছিল যে, ২০২৭ বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখে নির্বাচকেরা তরুণ ক্রিকেটারদের দিকে এগোতে চাইছেন। যদিও বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সইকিয়া (Devajit Saikia) প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, লর্ডসের ম্যাচটিকে রোহিতের শেষ ম্যাচ হিসেবে দেখার কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
তারপরই লর্ডসে রোহিতের ব্যাটে এল জবাব। ১১০ বলে ১৩৮ রান করে তিনি শুধু নিজের ফর্মের সমালোচকদেরই চুপ করাননি, তৈরি করেছেন ঐতিহাসিক নজিরও। লর্ডসে পুরুষদের ওয়ানডেতে শতরান করা প্রথম ভারতীয় ব্যাটার হয়েছেন রোহিত। তাঁর ১৩৮ রানও ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারতের হয়ে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোরগুলির অন্যতম।
মজার বিষয়, সেই ইনিংস এসেছিল প্রবল চাপের মধ্যে। ইংল্যান্ড প্রথমে ৩৮৭ রান তোলার পর ভারতের সামনে ছিল ৩৮৮ রানের লক্ষ্য। সেই রান তাড়া করতে নেমে রোহিতের ব্যাটেই ভারত বড় স্বপ্ন দেখেছিল। শেষ পর্যন্ত ২৭ রানে ম্যাচ হারতে হলেও রোহিতের ইনিংস তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে।
পরিসংখ্যানও রোহিতের পক্ষেই কথা বলছে। গত অক্টোবর থেকে ১৫টি ওয়ানডেতে তাঁর সংগ্রহ ৭২৭ রান, রয়েছে দু’টি শতরান। গড় ৫১.৯২, যা তাঁর কেরিয়ারের ওয়ানডে গড়ের থেকেও বেশি। ফলে শুধুমাত্র সাম্প্রতিক ফর্মের ভিত্তিতে তাঁকে বাদ দেওয়ার যুক্তি কতটা শক্তিশালী, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
এই পরিস্থিতিতেই রোহিতকে নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার পক্ষে অজিঙ্ক রাহানে (Ajinkya Rahane)। ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক মনে করেন, ২০২৭ বিশ্বকাপ খেলতে রোহিত আগ্রহী হলে তাঁকে পরিষ্কারভাবে সেই সুযোগের কথা জানানো উচিত। তাঁর মতে, বছরের পর বছর ভারতীয় ক্রিকেটে অসাধারণ অবদান রাখা একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে পাওয়া দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাহানের বক্তব্যের মূল সুর হল, রোহিতের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিটি সিরিজের পর নতুন করে প্রশ্ন তোলা উচিত নয়। তাঁর মতে, একবার যদি টিম ম্যানেজমেন্ট সিদ্ধান্ত নেয় যে রোহিত ২০২৭ বিশ্বকাপের পরিকল্পনায় রয়েছেন, তা হলে সেই আস্থাটা তাঁকে দেওয়া দরকার। এতে ক্রিকেটারের মানসিক স্বস্তিও বাড়বে এবং তিনি নিজের পারফরম্যান্সে আরও মন দিতে পারবেন।
ক্রিকেটে ছন্দের গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেছেন রাহানে। তাঁর মতে, একজন ক্রিকেটার মানসিকভাবে নিশ্চিন্ত থাকলে নিজের সেরাটা দেওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। রোহিতের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা এবং ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা এমন সম্পদ, যা তরুণ ক্রিকেটারদের দিয়ে রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
তবে ২০২৭ বিশ্বকাপ এখনও অনেক দূরের পথ। দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবোয়ে ও নামিবিয়ায় আয়োজিত সেই বিশ্বকাপের সময় রোহিতের বয়স ৪০ পেরিয়ে যাবে। তাই তাঁর জায়গা শুধু অতীতের কৃতিত্ব দিয়ে নিশ্চিত করা যাবে না—ফিটনেস, ধারাবাহিকতা এবং দলের প্রয়োজনও শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
রোহিত নিজেও আপাতত অবসরের জল্পনাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। লর্ডসে ১৩৮ করার পর তাঁর বার্তা ছিল, ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করাই তাঁর ফোকাস। ফলে বল এখন অনেকটাই নির্বাচকদের কোর্টে।
লর্ডসের সেই ইনিংস অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—রোহিত শর্মাকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর ব্যাটকে উপেক্ষা করা কঠিন। ২০২৭ বিশ্বকাপে তিনি থাকবেন কি না, তার উত্তর এখনই নিশ্চিত নয়। কিন্তু ১৩৮ রানের সেই ইনিংসের পর ‘রোহিতের সময় শেষ’—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যে এত সহজ নয়, তা আরও একবার বুঝিয়ে দিয়েছেন ভারতীয় দলের এই অভিজ্ঞ ওপেনার।




