কলকাতা: ১৯৪৭-এর দেশভাগের ক্ষত, উদ্বাস্তু মানুষের যন্ত্রণা এবং বাংলার সামাজিক-অর্থনৈতিক অভিঘাতকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে এবার রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিশেষ কর্মসূচির ডাক। ১৪ অগস্ট ‘দেশ বিভাজন দিবস’ পালনের জন্য রাজ্যের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আবেদন জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আচার্য আরএন রবি (R. N. Ravi)। লোক ভবনের তরফে রবিবার প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পাশাপাশি অধীনস্থ কলেজগুলিতেও এই দিনটি পালনের কথা বলা হয়েছে।
রাজ্যপালের এই বার্তায় দেশভাগের ইতিহাস নতুন করে আলোচনায় এসেছে। লোক ভবনের বক্তব্য, ১৯৪৭-এর বিভাজনের অভিঘাতে পশ্চিমবঙ্গ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলির অন্যতম। লক্ষ লক্ষ মানুষকে ঘরছাড়া হতে হয়েছিল, প্রাণহানি ঘটেছিল এবং তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছিল বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায় সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জানা প্রয়োজন। দেশভাগের যাঁরা প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা স্মরণ করার পাশাপাশি সমাজে বিভাজন তৈরি করে এমন শক্তি ও প্রবণতা সম্পর্কেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করার প্রয়োজন রয়েছে বলে রাজ্যপালের বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই নয়, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজগুলিতেও ১৪ অগস্ট ‘দেশ বিভাজন দিবস’ পালন করার জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। অর্থাৎ রাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির বিস্তৃত পরিসরে দেশভাগের ইতিহাস ও তার অভিঘাত নিয়ে আলোচনা, স্মরণসভা কিংবা সচেতনতামূলক কর্মসূচির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় অবিভক্ত বাংলা ও পঞ্জাব বিভক্ত হয়। ১৪ অগস্ট পাকিস্তান পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৫ অগস্ট ভারত স্বাধীনতা অর্জন করে। দেশভাগের ভয়াবহতা স্মরণে কেন্দ্রীয় স্তরেও ১৪ অগস্ট Partition Horrors Remembrance Day বা ‘বিভাজন বিভীষিকা স্মৃতি দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। ২০২১ সালে এই দিনটি পালনের ঘোষণা করা হয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যপালের এই উদ্যোগের পাশাপাশি স্বাধীনতা দিবস ঘিরে রাজ্য সরকারের একাধিক কর্মসূচিও সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ কর্মসূচি। চলতি বছর পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার এই কর্মসূচিকে বড় আকারে আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে নতুন সরকার। রাজ্যজুড়ে প্রায় ৭০ লক্ষ জাতীয় পতাকা বিতরণের পরিকল্পনার কথাও প্রকাশ্যে এসেছে।
১০ অগস্ট কলকাতায় ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ উপলক্ষে বড় তিরঙ্গা পদযাত্রারও আয়োজন করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে এই মিছিল হওয়ার কথা। প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী মিছিলটি নেতাজি মূর্তির এলাকা থেকে শুরু হয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের দিকে যাবে; বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণের সম্ভাবনায় কলকাতা পুলিশের তরফে যান চলাচল নিয়েও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ফলে স্বাধীনতা দিবসের আগে পশ্চিমবঙ্গে জাতীয়তাবাদ, দেশভাগের স্মৃতি এবং ইতিহাসচর্চাকে ঘিরে একাধিক কর্মসূচি সামনে আসছে। একদিকে ‘হর ঘর তিরঙ্গা’, অন্যদিকে ১৪ অগস্ট দেশভাগের স্মরণ—দুই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ইতিহাস ও স্বাধীনতার পর্বকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার বার্তাই স্পষ্ট হচ্ছে।
তবে রাজ্যপালের এই আবেদন বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কীভাবে কার্যকর হয়, সেদিকেই এখন নজর। ১৪ অগস্ট প্রতিটি ক্যাম্পাসে কী ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলিই ঠিক করবে। ইতিহাসের সেই গভীর ক্ষতকে স্মরণ করার পাশাপাশি দেশভাগের মানবিক মূল্য ও তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে কতটা আলোচনা তৈরি হয়, সেটিই হবে এই উদ্যোগের বড় পরীক্ষা।



