অর্ক সানা(সম্পাদক, নজরবন্দি.ইন): আরজি কর খুন ও ধর্ষণ কাণ্ডে ধৃত সিভিক ভলেন্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আগামীকাল অর্থাৎ সোমবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৫ জানা যাবে তাঁর কি শাস্তি হতে চলেছে। সঞ্জয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে মৃত্যুদণ্ড আর সর্বনিম্ন শাস্তি হতে পারে ১০ বছরের জেল। সঞ্জয় অপরাধী কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে, একা কিভাবে এই নারকীয় ঘটনা ঘটানো সম্ভব সেটা নিয়েই।
প্রথমত আরজি কর একটি সরকারি উচ্চমানের হাসপাতাল, সেখানে সর্বত্র চিকিৎসক, রোগী, রোগীর আত্মীয়, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী বিরাজমান। আছে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাও। এত কিছুর ফাঁক গলে বাইরে থেকে একজন এল(সিভিক ভলেন্টিয়ার সঞ্জয় রায়), নির্যাতিতাকে ধর্ষণ ও খুন করল, তারপর একটি কার্পেটের উপর তাঁকে পরিপাটি করে শুইয়ে রেখে গেল, কোন ধস্তাধস্তির চিহ্ন ছাড়া।


শুধু তাই নয়। ধর্ষণকারী তাঁর ছেঁড়া হেডফোন রেখে গেল নির্যাতিতার যে কার্পেটে শুয়ে আছে তাঁর তলায়! এরপর হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে চলে গেল। কেউ কিছু জানতে শুনতে বা দেখতে পেলনা, এমনকি নির্যাতিতাও কোন চিৎকার চেঁচামেচি করল না! কেমন অদ্ভুত লাগছে না? মনে হচ্ছেনা কোন কমার্শিয়ার ক্রাইম থ্রিলার দেখছি?
RG Kar কাণ্ড তো কমার্শিয়ার ক্রাইম থ্রিলার নয়, বাস্তব! তাহলে এই ৬ প্রশ্ন উত্তরহীন কেন?
আরজি কর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা শুধুমাত্র এক নারকীয় অপরাধ নয়, এটি আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিভিন্ন ফাঁকফোকরকেও উন্মোচিত করেছে। সঞ্জয়ের শাস্তি ঘোষণার পরেও, অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য প্রশ্ন এবং তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ আরও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি রাখে। সমাজ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার এই সমন্বয়হীনতা যদি না দূর করা যায়, তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। (বীর্য বিভ্রাট, নির্যাতিতার যোনিতে ১৫১ গ্রাম তরল নমুনার রিপোর্ট আসার আগেই হয়ে গেল বিচার!)

সিবিআই তদন্ত ও তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ
সিবিআই তদন্তে উঠে আসে, ধর্ষণ ও হত্যার প্রমাণ লোপাটের প্রচেষ্টা হয়েছিল। আরজি কর হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার প্রাক্তন ওসি অভিজিৎ মণ্ডলকে এই অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। তবে চার্জশিটের অভাবে তাঁরা জামিনে মুক্তি পান। তদন্তে সিবিআই দাবি করেছিল, সঞ্জয়কে গ্রেফতারের পরেও তাঁর পোশাক বাজেয়াপ্ত করতে পুলিশ দু’দিন দেরি করেছিল। এমন দেরি কেন হয়েছিল, সেই প্রশ্ন এখনও উত্তরহীন।


পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকা
তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল এই ঘটনার মূল অভিযুক্ত হিসেবে সঞ্জয় রায়কে ঘোষণা করলেও, তাঁর পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেন। যদিও ততক্ষণে জনমানসে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে সঞ্জয় একজন সিভিক ভলান্টিয়ার। কেন সঞ্জয়ের পরিচয় আড়াল করতে চাইলেন বিনীত? বিনীতের এই ভূমিকা পুলিশের প্রতি জনরোষ আরও বাড়িয়ে তোলে।
ঘটনাস্থল নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার তদন্তে উঠে আসে, আরজি করের সেমিনার হলের পাশের একটি ঘরের দেওয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছিল। এই দেওয়াল ভাঙার কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। হাসপাতালের পূর্ত বিভাগের দাবি, এটি ঘর সংস্কারের জন্য করা হয়েছিল। তবে এই সংস্কার কাজের সময় কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং রাতারাতি দেওয়াল ভাঙা প্রমাণ লোপাটের সম্ভাবনা জোরালো করে একথা অস্বীকার করা যায়কি?

নাগরিক মিছিল ও প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ
১৪ অগস্ট, ঘটনার প্রতিবাদে নাগরিক মিছিল বের হলে আরজি করের জরুরি বিভাগে হামলা এবং ভাঙচুর হয়। সেই সময় হাসপাতালের সেমিনার হলে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। দুষ্কৃতীরা জরুরি বিভাগে ঢুকে ভাঙচুর করে। ভাইরাল অডিয়োয় ‘সেমিনার হলে চল’ রবও শোনা যায়। যদিও পুলিশ পরে জানায়, ঘটনাস্থল সুরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু নাগরিক মিছিলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কারা, কেন আরজি করে তথ্যপ্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করল, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
ময়নাতদন্তের দেরি ও আত্মহত্যার খবর
নির্যাতিতার দেহের ময়নাতদন্ত ৯ অগস্ট সন্ধ্যায় হলেও, পুলিশ রাত পৌনে ১২টায় এফআইআর দায়ের করে। ভাইরাল অডিয়োয় নির্যাতিতার বাবার সঙ্গে কথা বলতে শোনা গিয়েছিল এক মহিলাকণ্ঠকে। তিনি নির্যাতিতার বাবাকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর কন্যার কী হয়েছে, স্পষ্ট করে জানাননি। ওই মহিলাকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘আপনার মেয়ে খুব অসুস্থ, তাড়াতাড়ি চলে আসুন। মনে হয় উনি সুইসাইড করেছেন।’’

ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা অর্থাৎ CCTV বিতর্ক
হাসপাতালে ধর্ষণ এবং খুন করা হয়েছিল কর্তব্যরত চিকিৎসককে! ঘটনার দিন রাতের সাড়ে ৩ ঘণ্টার CCTV ফুটেজে ধরা পড়েছে ৬৮ বার যাতায়াত। কিন্তু সিবিআই-এর দাবি, সঞ্জয় রায় ছাড়া কাউকে চেনা যায়নি ! আর জি কর-কাণ্ডের তদন্তে নেমে, ইমার্জেন্সি ভবনের চার তলার পালমোনারি মেডিসিন বিভাগে থাকা একমাত্র সিসিটিভির সাড়ে ৩ ঘণ্টার ফুটেজ পরীক্ষা করেছে সিবিআই। শিয়ালদা আদালতে চার্জশিটের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজের যে বিবরণ জমা দিয়েছে তারা, তাতে একমাত্র সঞ্জয় রায়কেই ‘identified’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি সবাই ‘could not be identified’। কারা তারা, যাঁদের পরিচয় সিবিআই এতদিন তদন্ত করেও জানতে পারল না?
সিবিআইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, ৯ অগাস্ট রাত আড়াইটা থেকে ভোর ৫টা ৫১ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা সিসি ক্যামেরার সামনে দিয়ে ৬৮ বার যাতায়াত করেছেন বিভিন্ন জন। যার মধ্যে ৩ বার যাতায়াত করেছেন ধৃত সঞ্জয় রায়। বিবরণে বলা হয়েছে – রাত ৪টে ৩ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে সঞ্জয়কে ওয়ার্ডের দিকে যেতে দেখা যায়। রাত ৪টে ৩১ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে ওয়ার্ডের দিক থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে আবার ফিরে যেতে দেখা যায় ধৃতকে। রাত ৪টে ৩২ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে হেলমেট হাতে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় সঞ্জয় রায়কে। কে কী পরেছিলেন, কার চেহারা কী রকম – তার বিস্তারিত বিবরণ দিলেও কাউকেই নাকি চিনতে পারেনি সিবিআই। গলায় স্টেথো ঝোলানো, এক ব্যক্তির ছবিও ধরা পড়েছে। তবে তাঁকেও ‘could not be identified’ বলে উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি।







