নজরবন্দি ব্যুরো: ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে (RG Kar Medical College and Hospital) চিকিৎসক-পড়ুয়ার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা বদলে দিয়েছিল বাংলার রাজনীতি, প্রশাসন এবং চিকিৎসক আন্দোলনের চেহারা। দু’বছর পরে সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একাধিক পরিচিত মুখের অবস্থানও বদলেছে—কেউ জেলে, কেউ সাসপেন্ড, কেউ বদলি হয়েছেন। আবার কেউ এখনও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বহাল।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবশ্য থেকে গিয়েছে তদন্ত নিয়েই। সঞ্জয় রায়কে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় একমাত্র দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও নির্যাতিতার পরিবার শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, এই ঘটনায় আরও অনেকে জড়িত থাকতে পারেন। ২০২৬ সালে সেই প্রশ্নেই ফের তদন্তের দরজা খুলেছে। এপ্রিল মাসে কলকাতা হাই কোর্ট সঞ্জয় রায়কে ফের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয় এবং ৬ অগস্ট আদালত CBI-কে গোটা ঘটনাক্রম নতুন করে খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয়।

অভিজিৎ মণ্ডল—জামিনে মুক্ত, এখনও সাসপেন্ড
ঘটনার সময় টালা থানার অফিসার-ইন-চার্জ ছিলেন অভিজিৎ মণ্ডল। আরজি কর তাঁর থানা এলাকার মধ্যে পড়ায় প্রাথমিক তদন্তের ভূমিকা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠে। তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা এবং তদন্তে গাফিলতির অভিযোগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে CBI তাঁকে গ্রেফতার করেছিল।
তবে ধর্ষণ-খুনের মামলায় গ্রেফতারের ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট জমা দিতে পারেনি CBI। সেই কারণে ডিসেম্বর ২০২৪-এ সন্দীপ ঘোষের সঙ্গে জামিন পান মণ্ডলও।
জামিন পেলেও প্রশাসনিকভাবে তাঁর অবস্থান বদলায়নি। তিনি এখনও সাসপেন্ডেড। বিভাগীয় তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফলও প্রকাশ্যে আসেনি। অর্থাৎ, আদালতের মামলায় জামিন মিললেও চাকরিতে তাঁর ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত।

বিনীত গোয়ল—কমিশনার থেকে সাসপেন্ডেড IPS
আরজি কর কাণ্ডের সময় কলকাতা পুলিশের কমিশনার ছিলেন বিনীত গোয়ল। আন্দোলনকারীদের প্রবল দাবির মুখে তাঁকে কমিশনারের পদ থেকে সরানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অবশ্য প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তাঁকে দেখা যায়—এডিজি এসটিএফ এবং এডিজি আইনশৃঙ্খলার মতো পদেও ছিলেন তিনি।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন তাঁকে সেই পদ থেকে সরিয়ে দেয়। রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পরে ১৫ মে তাঁকে সাসপেন্ড করে নতুন সরকার। একই সঙ্গে বিভাগীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত হয়। জুলাইয়ে তাঁর সাসপেনশনের মেয়াদ আরও চার মাস বাড়ানো হয়েছে।
CBI-এর পুনরায় খোলা তদন্তে বিনীত গোয়লকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। তবে আরজি করের মূল ধর্ষণ-খুন মামলায় কলকাতা পুলিশের কমিশনার হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনও অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত এখনও সামনে আসেনি। তাঁর বিরুদ্ধে চলা বিভাগীয় প্রক্রিয়াই এখন মূল বিষয়।

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়—পুলিশের ‘মুখ’ থেকে সাসপেন্ড
ঘটনার সময় কলকাতা পুলিশের ডিসি সেন্ট্রাল ছিলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। মূল অপরাধস্থলের তদন্তের সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তবে ধর্মতলা-সহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন ও জমায়েত সামলানোর দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
আরজি কর আন্দোলনের সময়ে কলকাতা পুলিশের বক্তব্য সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে নজরে আসে। সেই কারণেই আন্দোলনকারীদের একাংশের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি।
২০২৬ সালের ১৫ মে বিনীত গোয়াল এবং অভিষেক গুপ্তের সঙ্গে ইন্দিরাকেও সাসপেন্ড করে রাজ্য সরকার। জুনে তিন অফিসারকেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয় এবং জুলাইয়ে তাঁদের সাসপেনশনের মেয়াদ আরও ১২০ দিন বাড়ানো হয়েছে।

অভিষেক গুপ্ত—ডিসি নর্থ থেকে বিভাগীয় তদন্তের মুখে
২০১১ ব্যাচের IPS অভিষেক গুপ্ত ছিলেন কলকাতা পুলিশের ডিসি নর্থ। আরজি কর তাঁর দায়িত্বাধীন এলাকার মধ্যে হওয়ায় প্রাথমিক পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্নের কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি।
১৪ অগস্ট রাতে আরজি কর হাসপাতালে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাতেও তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওই রাতের পরিস্থিতিতে তিনি নিজেও আহত হয়েছিলেন। আন্দোলনকারীদের দাবির পর তাঁকে বিনীত গোয়ালের সঙ্গে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছিল।
২০২৬ সালে নতুন সরকার তাঁকেও সাসপেন্ড করেছে। বিভাগীয় তদন্ত চলছে এবং CBI-ও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জুনে তিন IPS অফিসারের বিরুদ্ধে চার্জ দেওয়া হয় এবং জুলাইয়ে সাসপেনশনের মেয়াদ আরও চার মাস বাড়ানো হয়।

সন্দীপ ঘোষ—ধর্ষণ-খুন মামলায় জামিন, দুর্নীতি মামলায় জেলেই
আরজি করের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ ছিলেন ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক মুখ। ধর্ষণ-খুনের ঘটনার পর তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তে গাফিলতি এবং তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি আরজি কর হাসপাতালের আর্থিক অনিয়মের মামলাতেও CBI তাঁকে গ্রেফতার করে।
ধর্ষণ-খুনের মামলায় ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট না দেওয়ায় ডিসেম্বর ২০২৪-এ তিনি জামিন পান। কিন্তু সেই জামিনের অর্থ জেল থেকে মুক্তি নয়। আর্থিক দুর্নীতির পৃথক মামলায় তিনি বিচারবিভাগীয় হেফাজতেই রয়েছেন। ২০২৬ সালের মে মাসের রিপোর্টেও তাঁর জেল হেফাজতে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল।
এদিকে রাজ্য সরকার ২০২৬ সালের মে মাসে আর্থিক অনিয়মের মামলায় সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে ED-কে prosecution এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুমতিও দিয়েছে।

সঞ্জয় রায়—যাবজ্জীবন সাজা, তবু শেষ হয়নি প্রশ্ন
আরজি কর কাণ্ডে দ্রুত গ্রেফতার হওয়া একমাত্র ব্যক্তি সঞ্জয় রায়। কলকাতা পুলিশের সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয়কে ঘটনার পরদিন গ্রেফতার করা হয়। পরে CBI তদন্তভার নেওয়ার পরও তাঁকেই মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
শিয়ালদহ আদালত ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। CBI অবশ্য মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে কলকাতা হাই কোর্টে আবেদন করেছে।
কিন্তু এখানেই গল্প শেষ হয়নি। নির্যাতিতার পরিবার বারবার দাবি করেছে, সঞ্জয় একা এই ঘটনা ঘটিয়েছে—এই ব্যাখ্যা তারা মেনে নিতে পারছে না। সেই দাবির ভিত্তিতেই ২০২৬ সালে মামলার তদন্ত নতুন মোড় নেয়।
এপ্রিল মাসে কলকাতা হাই কোর্ট CBI-কে জেলে গিয়ে সঞ্জয় রায়কে ফের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়। আদালত জানিয়েছিল, প্রয়োজনে তদন্তকারীরা অন্য সন্দেহভাজনদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন।
এরপর ৬ অগস্ট কলকাতা হাই কোর্ট CBI-কে আরও বিস্তৃতভাবে নতুন করে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ঘটনার রাত থেকে শুরু করে নির্যাতিতার দেহ দাহ পর্যন্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহ ফের খতিয়ে দেখতে হবে। আগের তদন্তের ফলাফল দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নতুন করে তদন্তের উপর জোর দিয়েছে আদালত।

নারায়ণস্বরূপ নিগম—সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এখনও সেই পদেই
আরজি কর কাণ্ডের সময় রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব ছিলেন নারায়ণস্বরূপ নিগম। আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল তাঁর অপসারণ। জুনিয়র চিকিৎসকদের অনশন ও আলোচনার সময়ও তাঁর নাম ঘুরেফিরে সামনে এসেছে।
কিন্তু সরকার বদলের পরও তাঁর ক্ষেত্রে কোনও বড় প্রশাসনিক পরিবর্তন হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ দফতরের সরকারি ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত নারায়ণস্বরূপ নিগমকেই Principal Secretary হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ আরজি করের পর যে প্রশাসনিক মুখগুলিকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে অন্তত একজন এখনও একই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল তাঁর পদে কোনও তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনেনি।

রিমঝিম সিংহ—রাতদখল থেকে ‘রাত দখল, দিন বদল’
আরজি কর কাণ্ডের পর ১৪ অগস্টের ‘রাত দখল’ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন প্রেসিডেন্সির প্রাক্তনী রিমঝিম সিংহ। তাঁর ডাকে সেই রাতে কলকাতা-সহ বিভিন্ন জায়গায় বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন।
দু’বছর পরে তাঁর আন্দোলনের ধরন বদলেছে, কিন্তু লক্ষ্য বদলায়নি। ‘রাত দখল, দিন বদল’ নামে সংগঠন তৈরি করে তিনি গৃহশ্রমজীবী মহিলাদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। বেতন, ছুটি এবং মাতৃত্বকালীন অধিকারের মতো বিষয় এখন তাঁদের কাজের কেন্দ্রে।
রিমঝিমের বক্তব্য, আরজি কর আন্দোলন শেষ হয়ে যায়নি। মহিলাদের রাতের শহরকে নিজেদের জায়গা হিসেবে দাবি করার যে বার্তা সেই আন্দোলন দিয়েছিল, সেটিকে সামাজিক পরিসরে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।

সুবর্ণ গোস্বামী—আন্দোলনে সক্রিয়, এখনও দার্জিলিঙে
আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত চিকিৎসক ছিলেন সুবর্ণ গোস্বামী। জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলন, অবস্থান এবং একাধিক কর্মসূচিতে তাঁকে নিয়মিত দেখা গিয়েছিল। আন্দোলনের সময় তাঁকে একাধিক থানায় হাজিরার জন্য ডাকা হয় এবং মামলাও হয়।
পরবর্তী সময়ে তাঁকে দার্জিলিঙে বদলি করা হয়। ২০২৫ সালের মার্চে তাঁকে দার্জিলিং টিবি হাসপাতালের সুপার হিসেবে পাঠানোর খবর প্রকাশ্যে আসে।
দু’বছর পরেও সেই বদলি তাঁর কর্মজীবনের বাস্তবতা। ৯ অগস্ট আরজি করের ন্যায়বিচারের দাবিতে কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। তাঁর বক্তব্য, কলকাতার রাস্তায় নিয়মিত থাকতে না পারলেও আন্দোলনের দাবি থেকে তিনি সরে যাননি।

অনিকেত মাহাতো—আন্দোলনের মুখ থেকে ফের চিকিৎসার লড়াইয়ে
আরজি করের PG চিকিৎসক অনিকেত মাহাতো প্রথম থেকেই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন। সাংবাদিক বৈঠক, আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক—বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।
পরবর্তীতে সিনিয়র রেসিডেন্টশিপের পোস্টিং নিয়ে বিতর্কেও তাঁর নাম সামনে আসে। গত জুনে ৩০ লক্ষ টাকা জমা দিয়ে বন্ড থেকে মুক্ত হওয়ার পর তিনি ফের নিজের পেশাগত জীবনের দিকে এগিয়েছেন।
তবে তাঁর বক্তব্যে আরজি কর এখনও অতীতের ঘটনা নয়। সঞ্জয় রায়কে একমাত্র অভিযুক্ত হিসেবে দেখিয়ে পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নেই তিনি এখনও অনড়। থ্রেট কালচারের বিরুদ্ধে চিকিৎসকদের আন্দোলনও পুরোপুরি থামেনি বলে তাঁর দাবি।
দু’বছর পেরিয়ে আরজি করের সেই পরিচিত মুখগুলির হিসাব তাই একরকম নয়। সঞ্জয় রায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেলে, সন্দীপ ঘোষ অন্য মামলায় জেল হেফাজতে, অভিজিৎ মণ্ডল জামিনে থাকলেও সাসপেন্ডেড। বিনীত গোয়াল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং অভিষেক গুপ্তের সাসপেনশনও বহাল রয়েছে। অন্য দিকে সুবর্ণ গোস্বামী বদলির জায়গাতেই, আর নারায়ণস্বরূপ নিগম এখনও স্বাস্থ্য দফতরের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—দু’বছর পরও আরজি করের তদন্তের শেষ কথা বলা যাচ্ছে না; আদালতের নির্দেশে নতুন করে সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা শুরু হয়েছে।



