রেজিনগরে চতুর্থ মমতার দল, ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলে সরব নেত্রী

নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ফল নিয়ে প্রশ্ন, ভোটের হিসাব ও ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে সরব হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুই কেন্দ্রের ফলাফল নিয়ে সরাসরি সন্তোষ প্রকাশ না করে তিনি ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, কিছু বুথে মোট ভোটারের তুলনায় বেশি ভোট পড়ার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের মাধ্যমে ভোট করানোর কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তবে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট বুথের সরকারি নথি ও নির্বাচন কমিশনের তথ্য খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

দুই কেন্দ্রের ফলাফল ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই রেজিনগরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের প্রার্থীর ভোটপ্রাপ্তি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে, মমতা তৃণমূলের প্রার্থী রাবিউল আলম চৌধুরী পেয়েছেন তুলনামূলকভাবে অল্প ভোট। ফলে ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগের পাশাপাশি দলের নির্বাচনী ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, কিছু বুথে ভোটের হিসাবে অস্বাভাবিকতা ছিল। একটি বুথে ৭০০ ভোট থাকার জায়গায় ৯০০-র বেশি ভোট পড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

মমতার বক্তব্য, পুলিশের মাধ্যমে ভোট করালে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাঁর এই মন্তব্যের পর দুই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ ও গণনা নিয়ে রাজনৈতিক তরজা আরও বেড়েছে।

তবে কোনও বুথে প্রকৃত ভোটের সংখ্যা নির্ধারণ করতে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফল, ভোটার তালিকা, ভোটদানের নথি এবং সংশ্লিষ্ট বুথের হিসাব মিলিয়ে দেখা জরুরি। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে কারচুপির অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে ধরা যায় না।

এর আগে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসও অনিয়মের অভিযোগ তুলে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধী শিবিরের একাংশের প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে প্রথমে প্রার্থী দিয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। কিন্তু পরে সেই প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। এরপর কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের কথা জানিয়েছিল মমতার শিবির।

নন্দীগ্রামে শেষ পর্যন্ত বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ জয়ী হন। কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান দ্বিতীয় স্থানে শেষ করেন। বিজেপির জয়ের ব্যবধানও ছিল উল্লেখযোগ্য। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই কেন্দ্রেই বিজেপির সাফল্য রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

নন্দীগ্রামে প্রার্থী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের কারণে মমতার শিবিরের ভোটের ফল ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আলাদা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। কিন্তু রেজিনগরে নিজস্ব প্রার্থী থাকলেও ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। সেই কারণেই দুই কেন্দ্রের ফলাফলকে ঘিরে তৃণমূলের বিভক্ত অংশগুলির অবস্থান এবং ভোটারদের সমর্থন নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

মুর্শিদাবাদের রেজিনগর কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের ফলাফল এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজেপির প্রাপ্ত ভোট ছিল ১ লক্ষ ২৯ হাজারের বেশি। আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী গোলাম নবী আজাদ দ্বিতীয় স্থানে থাকেন। কংগ্রেসও মমতা তৃণমূলের প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের প্রার্থী রাবিউল আলম চৌধুরী রেজিনগরে খুব কম ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীও তাঁর পিছনে ছিলেন। ফলে রেজিনগরে মমতা শিবিরের ফলাফল রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উল্লেখ্য, রেজিনগর কেন্দ্রটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। অতীতের নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিভিন্ন দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গিয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আমজনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীর এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন। উপনির্বাচনে বিজেপির বড় ব্যবধানের জয় তাই এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

রেজিনগরের ফলাফল সামনে আসার পর সংখ্যালঘু ভোটের সমীকরণ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে আলোচনা শুরু হয়েছে। অতীতে এই এলাকায় তৃণমূলের উল্লেখযোগ্য সমর্থন ছিল। কিন্তু উপনির্বাচনে মমতা তৃণমূলের প্রার্থী অল্প ভোট পাওয়ায় সেই সমর্থনের পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

তবে শুধুমাত্র ফলাফলের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভোট কোন দিকে গিয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তার জন্য বুথভিত্তিক ফলাফল, আগের নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা এবং নির্ভরযোগ্য নির্বাচনী বিশ্লেষণ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলির বিভাজন, প্রার্থী নির্বাচন, স্থানীয় ইস্যু এবং ভোটের প্রচারও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের কাছে রেজিনগরের ফলাফল তাই শুধু একটি আসনে পরাজয়ের বিষয় নয়; দলের সংগঠন ও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়েও পর্যালোচনার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচন নিয়ে কারচুপির অভিযোগের নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক নথি, বুথভিত্তিক ভোটের হিসাব এবং অভিযোগের ভিত্তিতে গৃহীত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হবে। কোনও অনিয়মের অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত হয়ে যায় না। আবার অভিযোগের গুরুত্ব যাচাই না করেও তা খারিজ করা যায় না।

এখন নজর থাকবে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। একই সঙ্গে রেজিনগরে মমতা তৃণমূলের কম ভোট পাওয়ার কারণ খুঁজতে দলের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেটিও রাজনৈতিক মহলের আলোচনায় থাকবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন