দুর্গাপুজোর প্রস্তুতির মধ্যেই বাংলাদেশে একাধিক মন্দিরে নির্মাণাধীন প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ সামনে এসেছে। কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি এবং টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি ঘিরে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাতের অন্ধকারে মন্দিরে ঢুকে প্রতিমার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। ঘটনাগুলির তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তবে হামলাকারীদের পরিচয় কিংবা তাঁদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনও চূড়ান্ত তথ্য সামনে আসেনি।
বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি যখন শেষ পর্যায়ে, তখন এই ধরনের ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দা ও পুজো উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে ৮ অক্টোবর গভীর রাতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় মন্দির কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের গোড়ার মধ্যে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর-সহ কয়েকটি এলাকায় প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি পৌরসভার খয়েরচারা সর্বজনীন মাতৃমন্দিরে নির্মাণাধীন প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর রাতের দিকে এই ঘটনা ঘটে। শুক্রবার সকালে মন্দিরে গিয়ে প্রতিমাগুলি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা।
মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক কৌশিক বিশ্বাসের বক্তব্য, রাত প্রায় ২টো পর্যন্ত তাঁরা মন্দিরে ছিলেন। প্রতিমা তৈরির কাজ শেষে সেগুলি ঢেকে রেখে তাঁরা বাড়ি ফিরে যান। সকালে এসে প্রতিমার বিভিন্ন অংশ ভাঙা দেখতে পান। তাঁর অনুমান, রাত ২টোর পর এই ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্গা, গণেশ, লক্ষ্মী এবং দুর্গার বাহন সিংহের মূর্তি-সহ অন্তত চারটি প্রতিমার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মন্দিরের বাঁশের বেড়া ভেঙে ভিতরে ঢোকার অভিযোগও উঠেছে। কুমারখালি থানার পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং দায়ীদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন মন্দির পরিদর্শন করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি অভিযুক্তদের শনাক্ত করে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তবে এই ঘটনার পিছনে কারা রয়েছে, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
কুষ্টিয়ার ঘটনার আগে বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী পশ্চিমপাড়া এলাকায় একটি দুর্গামন্দিরে নির্মাণাধীন সাতটি প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ রাত থেকে ১ অক্টোবর সকালের মধ্যে ঘটেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন।
জামুর্কী আর্য সমিতির অধীনে পরিচালিত মন্দিরটিতে প্রায় ৮৫ বছর ধরে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। চলতি বছরের পুজোর জন্য দুর্গা-সহ সাতটি প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছিল। প্রতিমাগুলির মাটির কাজ প্রায় শেষ হলেও রং করার কাজ বাকি ছিল।
সকালে মন্দিরে এসে প্রতিমাগুলি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার-সহ পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের পুজোর প্রস্তুতির মধ্যে প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মন্দির কর্তৃপক্ষ দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ এবং রাজবাড়ি সদর উপজেলার বাণীবহ বাজার এলাকার দুর্গামন্দিরেও নির্মাণাধীন প্রতিমার মুখমণ্ডল ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সিলেটের বালাগঞ্জেও দুর্গাপুজোর মণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগে প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
তবে এই সব ঘটনার তারিখ, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিমার সংখ্যা, মামলা ও গ্রেফতারের সর্বশেষ অবস্থা এক নয়। প্রতিটি ঘটনার পৃথক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। সব ঘটনাকে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখানোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি।
প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগগুলির পর স্থানীয় প্রশাসনের কাছে দোষীদের শনাক্ত করা এবং পুজোমণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছিল। কুষ্টিয়ার কুমারখালিতেও পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
দুর্গাপুজোর আগে মন্দির ও পুজোমণ্ডপের নিরাপত্তা, রাতের নজরদারি এবং অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত—এই বিষয়গুলি এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, কোনও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে যাচাই না করা তথ্য ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
বাংলাদেশে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতির সময়ে একাধিক প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ, অভিযুক্তদের পরিচয় এবং সম্ভাব্য উদ্দেশ্য তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আপাতত স্থানীয় বাসিন্দা ও পুজো উদ্যোক্তাদের নজর পুলিশের তদন্ত এবং প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে।



