দিল্লিতে কক্রোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janta Party বা CJP)-র বিক্ষোভ ঘিরে শনিবার, ১০ অক্টোবর, ব্যাপক ধরপাকড় চালাল পুলিশ। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (Gyanesh Kumar) পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের প্রতিবাদে যন্তর মন্তরে জমায়েতের ডাক দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর আগেই দিল্লি, গুরুগ্রাম, চণ্ডীগড় ও মুম্বইয়ের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিরোধী নেতা, আন্দোলনকারী, আইনজীবী, ছাত্রছাত্রী ও কনটেন্ট নির্মাতাদের আটক করা হয়। আজ দিল্লিতে আটক ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৬,০০০-এ পৌঁছেছিল বলে খবর।
আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ এবং ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। বিক্ষোভের অন্যতম উদ্যোক্তা অভিজিৎ দিপকে এবং তাঁর দলের আরও দুই নেতা সওরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও দিল্লিতে পৌঁছনোর পর বিমান থেকেই আটক করা হয়।
দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরের কর্মসূচিতে অনুমতি দেয়নি। পুলিশের বক্তব্য, নির্ধারিত সময়ের আগে আবেদন জমা পড়েছিল—প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর আবেদন করা হলেও নিয়মে ১০ দিনের আগাম নোটিসের কথা বলা হয়েছিল। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার যুক্তিতে বিক্ষোভস্থল এবং সেখানে যাওয়ার রাস্তায় কড়াকড়ি করা হয়। তবে পুলিশের এই পদক্ষেপের ফলে প্রতিবাদ শুধু নির্দিষ্ট মঞ্চে আটকে থাকেনি; বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট জমায়েত ও মিছিলের চেষ্টা দেখা যায়।
CJP-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, সওরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে আটক করার ঘটনাটি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। তাঁরা বিক্ষোভে যোগ দিতে দিল্লি যাচ্ছিলেন। বিমান অবতরণের পর তাঁদের বাইরে বেরোতে না দিয়ে, বিমানের মধ্যেই আটক করা হয়। দিপকে আটক হওয়ার আগে একটি ভিডিওতে দলের পরবর্তী নেতৃত্বের দায়িত্ব অজিঙ্ক্য শিন্ডের হাতে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
দিল্লির বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশি অভিযান চলার মধ্যেই যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন ছাত্র সংগঠন ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা। দিল্লি হাটের দিকে মিছিল করার সময় অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (All India Students’ Association বা AISA)-এর নেত্রী নেহা বোরা, যোগেন্দ্র যাদব এবং প্রশান্ত ভূষণকে আটক করা হয়। স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (Students’ Federation of India বা SFI)-র এক নেতার দাবি, সংগঠনের ৪০০-র বেশি সদস্যকে আটক করা হয়েছে।
দিল্লিতে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও ছিলেন দলের একাধিক নেতা। ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, সাকেত গোখলে ও প্রতিমা মণ্ডলকেও আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। দক্ষিণ অ্যাভিনিউ বাসস্ট্যান্ডের কাছে মমতা ধর্নায় বসেছিলেন এবং তাঁকে সেখান থেকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছিলেন। অন্য দিকে, কেরল হাউসের কাছে আটক হন পিনারাই বিজয়ন; তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাজ্যসভার সাংসদ জন ব্রিটাস এবং কেরলের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী কে এন বালাগোপাল।
গুরুগ্রামে নিজের বাসভবন থেকে আটক করা হয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে। চণ্ডীগড়ে বিক্ষোভ চলাকালীন আটক হন দিল্লির প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী মণীশ সিসোদিয়া। মুম্বইয়েও CJP-র কর্মসূচির সমর্থনে পথে নামা ব্যক্তিদের আটক করা হয়। সেখানে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীকে আটক করার খবর সামনে আসে। ফলে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে পুলিশি পদক্ষেপ শুধু দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি।
পুলিশি পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন কেজরিওয়াল। তাঁর অভিযোগ, প্রতিবাদ দমন করতে সরকার বিরোধী কণ্ঠস্বরকে আটক করছে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সংকুচিত করা হচ্ছে। তিনি পরিস্থিতিকে জরুরি অবস্থার থেকেও খারাপ বলে মন্তব্য করেন। এগুলি কেজরিওয়ালের রাজনৈতিক অভিযোগ; সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্যকে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে দেখা উচিত নয়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রভাব পড়ে দিল্লির সাধারণ যাতায়াতেও। কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন রাস্তায় ব্যারিকেড ও তল্লাশি চালানো হয়। একাধিক মেট্রো স্টেশনে প্রবেশের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এবং ট্রেন চলাচলেও বিঘ্নের খবর প্রকাশিত হয়। যন্তর মন্তরের কর্মসূচিকে ঘিরে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়েছিল রাজধানীর কিছু অংশে।
বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে SIR-প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক। CJP ও তাদের সমর্থকদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বহু যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি তুলেছে সংগঠনটি। অন্য দিকে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধনের প্রক্রিয়াকে নিয়মমাফিক বলে ব্যাখ্যা করেছে; ভোটার তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগও অস্বীকার করেছে বিজেপি।
যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়া এবং প্রতিবাদস্থলে পৌঁছনোর আগেই একের পর এক নেতাকে আটক করার ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন—নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তি দেখিয়ে প্রশাসন কতটা পর্যন্ত জমায়েত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আর শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে। এই প্রশ্নের রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি আইনি তাৎপর্যও রয়েছে।



