রেজিনগর এবং নন্দীগ্রাম—রাজ্যের দুই হেভিওয়েট বিধানসভা কেন্দ্রে আসন্ন উপনির্বাচন ঘিরে এবার আরও জমে উঠল রাজনৈতিক লড়াই। প্রথম বার একই দলের দুই শিবিরকে মুখোমুখি দেখা যেতে পারে ভোটের ময়দানে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস যেমন দুই কেন্দ্রে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তেমনই অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন ঋতব্রত শিবিরও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে নামার কথা জানিয়ে দিল। এমনকি দলের প্রতীক না মিললে নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ের প্রস্তুতিও রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
বুধবার সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্য বিধানসভায় ঋতব্রত শিবিরের মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামান জানান, রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম—দুই কেন্দ্রেই তাঁরা প্রার্থী দেবেন। ইতিমধ্যেই জেলা নেতৃত্বের কাছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম চাওয়া হয়েছে। স্থানীয় নেতৃত্ব ও কর্মীদের মধ্য থেকেই প্রার্থী বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর প্রার্থীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
প্রতীক নিয়েও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে ঋতব্রত শিবির। আখরুজ্জামানের দাবি, তাঁরা ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’-এর নামেই মনোনয়ন জমা দেবেন এবং ঘাসের উপর জোড়াফুল প্রতীক চেয়েই লড়বেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশন তাঁদের প্রতীক না দিলে বিকল্প পথও তৈরি রাখা হচ্ছে।
সেক্ষেত্রে প্রার্থীরা নির্দল হিসেবে ভোটে লড়বেন। কমিশন যে প্রতীক বরাদ্দ করবে, সেটিই ব্যবহার করা হবে বলে জানিয়েছেন আখরুজ্জামান। তাঁর বক্তব্য, প্রতীক না পেলেও ভোটের ময়দান থেকে তাঁরা সরে দাঁড়াবেন না। অর্থাৎ প্রতীক নিয়ে জটিলতা তৈরি হলেও রেজিনগর ও নন্দীগ্রামে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না।
তবে এই লড়াইয়ের নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূলের প্রতীক ও দলীয় পরিচয়ের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘ আইনি এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন। একই দলের নামে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিতে পারেন ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের অনুমোদিত প্রার্থী কে হবেন এবং দলীয় প্রতীক কার হাতে থাকবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই মুহূর্তে কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের দাবি, নির্বাচন কমিশনের নথিতে এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তৃণমূলের চেয়ারপার্সন। অন্যদিকে ঋতব্রত শিবিরও তৃণমূলের প্রতীকের দাবিতে কমিশনের কাছে আবেদন জানিয়েছে। সেই আবেদন সংক্রান্ত প্রক্রিয়া এখনও নিষ্পত্তি হয়নি বলেই জানা যাচ্ছে।
ফলে কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপরই অনেকটাই নির্ভর করছে দুই শিবিরের ভোট-সমীকরণ। কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের ধারণা, প্রতীক নিয়ে ঋতব্রত শিবিরের আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের প্রার্থীদের জোড়াফুল প্রতীক পেতে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। অন্যদিকে ঋতব্রত শিবিরও প্রতীক না পাওয়ার সম্ভাবনা মাথায় রেখেই নির্দল হিসেবে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আখরুজ্জামান বুধবার বলেন, মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় তাঁদের প্রার্থীরা নিজেদের তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবেই উল্লেখ করবেন এবং ঘাসের উপর জোড়াফুল প্রতীক দাবি করবেন। কিন্তু প্রতীক জমা দেওয়ার শেষ সময় পর্যন্ত কমিশন তা না দিলে তাঁরা নির্দল হিসেবে নির্বাচনে লড়বেন।
এই পরিস্থিতিতে রেজিনগর ও নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন শুধু দুই প্রার্থীর লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না। একই দলের নাম, প্রতীক এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার—তিনটি বিষয়ই এবার ভোটের ময়দানে পরীক্ষা হতে চলেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর ঋতব্রত শিবির প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করার পর দুই কেন্দ্রের সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে।
শেষ পর্যন্ত জোড়াফুল প্রতীক কার হাতে থাকে এবং প্রতীক না পেলে ঋতব্রত শিবিরের নির্দল প্রার্থীরা কতটা ভোট টানতে পারেন—এই দুই প্রশ্নই এখন রেজিনগর ও নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনের অন্যতম বড় আকর্ষণ। ফলে ভোটের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই দুই কেন্দ্রে তৃণমূলের অন্দরের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে এসেছে।



