নজরবন্দি ব্যুরো: অযোধ্যার রাম মন্দিরের দান-সামগ্রী চুরি ও গরমিলের অভিযোগে নতুন করে চাপ বাড়ল মন্দির পরিচালনাকারী ট্রাস্টের উপর। ফৈজাবাদ বার অ্যাসোসিয়েশন (Faizabad Bar Association) চম্পত রাই (Champat Rai), অনিল মিশ্র (Anil Mishra) এবং মন্দিরের আধিকারিক গোপাল রাওয়ের বিরুদ্ধে FIR দায়েরের দাবি তুলেছে। যদিও এই অভিযোগের তদন্তে পরবর্তী সময়ে SIT-এর চূড়ান্ত রিপোর্টে চম্পত রাই ও অনিল মিশ্রের বিরুদ্ধে সরাসরি আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে রিপোর্ট প্রকাশ্যে এসেছে।
২ জুলাই অযোধ্যার রাম জন্মভূমি থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দেয় বার অ্যাসোসিয়েশন। তার আগে আইনজীবীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। অভিযোগে বলা হয়, ভক্তদের দান করা নগদ টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী চুরির ঘটনায় ট্রাস্টের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন এবং তাঁদের বিরুদ্ধেও মামলা হওয়া উচিত।
বার অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগে ১০ লক্ষ টাকা এবং ৫৮ লক্ষ টাকা উদ্ধারের ঘটনাকেও প্রশ্নের মুখে তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই টাকা উদ্ধার সংক্রান্ত তথ্য FIR-এ যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে এগুলি বার অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, তদন্তে প্রমাণিত তথ্য নয়—এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনায় আগে থেকেই গ্রেফতার হয়েছে আটজন। তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্তের ভিত্তিতে মামলা এগোয়। একই সঙ্গে ফৈজাবাদ বার অ্যাসোসিয়েশন ঘোষণা করেছিল, গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তদের হয়ে তাদের কোনও সদস্য আদালতে সওয়াল করবেন না। এমনকি অভিযুক্তদের হয়ে মামলা লড়লে ৫ লক্ষ টাকা জরিমানার সিদ্ধান্তের কথাও সামনে আসে।
চম্পত রাই অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, অনিয়মের বিষয়টি তিনিই প্রকাশ্যে এনেছিলেন। এই বিতর্কের মধ্যেই তিনি রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দেন; পরে ৬ জুলাই ট্রাস্টের বৈঠকে সেই ইস্তফা গ্রহণ করা হয়।
তবে এই মামলায় পরবর্তী তদন্তের ফল বার অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগের ছবিটিকে আরও জটিল করেছে। ১৮ অগস্ট প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশ সরকারের কাছে জমা দেওয়া SIT-এর চূড়ান্ত রিপোর্টে চম্পত রাই ও অনিল মিশ্রের বিরুদ্ধে দান চুরিতে সরাসরি যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে তদন্তে ট্রাস্টের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নজরদারিতে একাধিক গুরুতর গাফিলতির কথাও উঠে এসেছে।
অর্থাৎ, একদিকে অযোধ্যার আইনজীবীদের অভিযোগ—প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে FIR না করে তদন্ত অসম্পূর্ণ রাখা হয়েছে; অন্যদিকে SIT-এর চূড়ান্ত রিপোর্ট বলছে, শীর্ষ স্তরে সরাসরি আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ মেলেনি। এই দুই অবস্থানের সংঘাতই এখন রাম মন্দিরের দান-কাণ্ডকে ফের আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।
এর মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে চম্পত রাইয়ের একটি ন’পাতার চিঠি। ১৮ অগস্টের ওই চিঠিতে তিনি রাম মন্দির নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রাক্তন আমলা ও নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান নৃপেন্দ্র মিশ্রের (Nripendra Misra) ভূমিকা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। রাইয়ের দাবি, নির্মাণ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি নৃপেন্দ্র মিশ্রের নেতৃত্বাধীন কমিটির মাধ্যমেই নেওয়া হত।
চিঠিতে রাই আরও দাবি করেছেন, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (Larsen & Toubro) এবং টাটা কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স (Tata Consulting Engineers)-এর মতো সংস্থাকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ওই নির্মাণ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পাশাপাশি কমিটিতে মিশ্রের পছন্দের কয়েকজনকে যুক্ত করার কথাও তিনি লিখেছেন।
নৃপেন্দ্র মিশ্র অবশ্য রাইয়ের চিঠি নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্কে যেতে চাননি। ২১-২২ অগস্টের প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, চিঠিটি তিনি দেখেননি এবং সংবাদমাধ্যমে যে ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিকে তিনি ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দান চুরি-কাণ্ডে SIT-এর চূড়ান্ত রিপোর্টের পর ফৈজাবাদ বার অ্যাসোসিয়েশন তাদের FIR-এর দাবিতে কতদূর এগোয়। কারণ অভিযোগ, তদন্ত এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফল—তিনটি বিষয়কে এক করে দেখলে গোটা ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র আড়াল হয়ে যেতে পারে। আপাতত প্রমাণিত বিষয় হল, মন্দিরের দান ব্যবস্থাপনায় গুরুতর প্রশাসনিক গাফিলতি নিয়ে SIT প্রশ্ন তুলেছে, কিন্তু চম্পত রাই ও অনিল মিশ্রের বিরুদ্ধে সরাসরি আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেই চূড়ান্ত রিপোর্টের খবর প্রকাশিত হয়েছে।



