নজরবন্দি ব্যুরো: ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে এবার এমন এক বদলের ঘোষণা, যার প্রভাব পড়তে পারে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রকেটগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসায়। IN-SPACe চেয়ারম্যান পবন গোয়েঙ্কা (Pawan Goenka) জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ISRO আর নিজে লঞ্চ ভেহিকল তৈরি করবে না; এই দায়িত্ব যাবে বেসরকারি সংস্থা বা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার হাতে। ইতিমধ্যেই PSLV-এর প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, আর LVM3-ও ঢুকে পড়েছে একই রাস্তায়।
বিষয়টি শুধু রকেট তৈরির কাজ বাইরে দিয়ে দেওয়ার নয়। ISRO-র তৈরি প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার, উৎপাদন এবং উৎক্ষেপণ পরিষেবার বড় বাজার এবার ভারতীয় শিল্পের সামনে খুলে যাচ্ছে। ISRO নিজেও দীর্ঘদিন ধরে operational technology শিল্পের হাতে তুলে দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে, কিন্তু PSLV এবং LVM3-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ লঞ্চ ভেহিকলের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের ব্যাপ্তি অনেক বড়।
কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই—এই বিশাল বাজারে ঢুকবে কারা? আর সেখানেই উঠে আসে আদানি-যোগের প্রসঙ্গ।
২০২৫ সালে Small Satellite Launch Vehicle বা SSLV-এর প্রযুক্তি বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় Adani-backed Alpha Design Technologies ফাইনালিস্ট হয়েছিল। সঙ্গে ছিল Hindustan Aeronautics Limited (HAL) এবং Bharat Dynamics Limited। শেষ পর্যন্ত ₹৫১১ কোটি টাকার চুক্তিতে SSLV প্রযুক্তি পায় HAL। অর্থাৎ, SSLV-এর ক্ষেত্রে আদানি-ঘনিষ্ঠ সংস্থার আগ্রহ ছিল সরাসরি এবং প্রতিযোগিতামূলক।
এখানেই থেমে নেই গল্প। PSLV উৎপাদন শিল্পের হাতে তুলে দেওয়ার আগের প্রক্রিয়াতেও Adani-Alpha Design consortium-এর নাম এসেছিল। ২০২১ সালে পাঁচটি PSLV তৈরির জন্য NSIL-এর দরপত্রে HAL-L&T consortium-এর পাশাপাশি Adani-Alpha Design, BEL ও BEML-এর consortium এবং BHEL প্রতিযোগিতায় ছিল। শেষ পর্যন্ত ₹৮২৪ কোটির বেশি মূল্যের চুক্তি পায় HAL-L&T।
অর্থাৎ আজকের PSLV প্রযুক্তি হস্তান্তরের নতুন প্রক্রিয়ায় আদানি সরাসরি প্রযুক্তি পেয়ে গিয়েছেন, এমন কোনও তথ্য নেই। কিন্তু ভারতের launch-vehicle manufacturing business-এ Adani-backed সংস্থার আগ্রহ যে বহুদিনের, তার নথিভুক্ত নজির রয়েছে। তাই নতুন করে PSLV ও LVM3-এর প্রযুক্তির দরজা খোলার পর আদানি-সহ বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলির দিকে নজর পড়াটাই স্বাভাবিক।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, এবার শুধু PSLV নয়—ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী operational rocket LVM3-ও বেসরকারি শিল্পের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে। IN-SPACe ভারতীয় private entities-এর কাছ থেকে LVM3-এর technology transfer-এর জন্য Expression of Interest বা EoI চেয়েছে। লক্ষ্য শুধু রকেট তৈরি নয়; end-to-end realisation, operation এবং commercialisation-এর সুযোগ তৈরি করা।
LVM3 কোনও সাধারণ রকেট নয়। এই রকেটই চন্দ্রযান-৩ (Chandrayaan-3)-এর মতো ঐতিহাসিক মিশনকে চাঁদের পথে পাঠিয়েছে। ISRO-র তথ্য অনুযায়ী, LVM3 প্রায় ৪.২ টন শ্রেণির পেলোড Geosynchronous Transfer Orbit-এ পাঠাতে সক্ষম। গগনযান (Gaganyaan)-এর মানব-উপযোগী launch vehicle হিসেবেও এর উপর নির্ভর করছে ভারত।
অন্যদিকে PSLV হল ISRO-র বহু বছরের ‘workhorse’। পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, navigation, communication থেকে শুরু করে চন্দ্রযান-১ ও মঙ্গলযানের মতো মিশন—এই রকেট ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির অন্যতম নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ। ISRO-র নিজস্ব নথিতেই PSLV-এর regular production শিল্পের মাধ্যমে করার পরিকল্পনা বহুদিন আগে থেকেই ছিল।
তবে বর্তমান সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আছে। আগের মডেলে শিল্প মূলত ISRO-র জন্য রকেটের বিভিন্ন stage, component বা vehicle তৈরি করত। এখন লক্ষ্য আরও এগিয়ে গিয়ে mature launch vehicle-এর technology, production, operation এবং commercialisation-এর দায়িত্ব শিল্পের হাতে তুলে দেওয়া। অর্থাৎ ISRO ধীরে ধীরে manufacturer-এর ভূমিকা কমিয়ে technology developer ও mission agency হিসেবে নিজেকে পুনর্গঠন করছে।
এই মডেলের প্রথম বড় পরীক্ষাও হয়ে গিয়েছে SSLV-তে। ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ISRO, NSIL, IN-SPACe এবং HAL-এর মধ্যে SSLV technology transfer agreement স্বাক্ষরিত হয়। ২০২৬ সালের অগস্টেও ISRO জানিয়েছে, SSLV-র প্রযুক্তি হস্তান্তর ইতিমধ্যেই চলছে এবং রকেটটিকে আরও production-friendly করার কাজ করা হচ্ছে।
তাহলে কি আগামী দিনে ISRO-র রকেট কারখানা কার্যত কর্পোরেট ভারতের হাতে চলে যাবে? সরকারের যুক্তি অবশ্য অন্যরকম। operational technology শিল্প তৈরি করবে, যাতে ISRO-র বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়াররা নতুন propulsion, reusable launch technology, human spaceflight, deep-space exploration এবং পরবর্তী প্রজন্মের launch system নিয়ে কাজ করতে পারেন।
এখানে একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রশ্নও স্বাভাবিকভাবেই উঠছে—রাষ্ট্রীয় অর্থে কয়েক দশক ধরে তৈরি হওয়া প্রযুক্তি যখন private industry-র হাতে যাচ্ছে, তখন তার বাণিজ্যিক মূল্য কে কতটা পাবে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা কতটা থাকবে? সম্প্রতি Moneycontrol-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণেও ISRO-র তৈরি প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো private players-এর হাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে institutional responsibility ও public assets নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে এটাও সত্যি যে, ভারতের মহাকাশ অর্থনীতি এখন আর শুধু ISRO-কেন্দ্রিক রাখতে চাইছে না কেন্দ্র। NSIL-এর কাজের মধ্যেই PSLV ও SSLV-এর production through industry এবং ISRO-র technology transfer অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলির জন্য নীতিগত দরজাও ইতিমধ্যেই খুলে দেওয়া হয়েছে।
আর সেই কারণেই আদানি-যোগের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার উত্তর এখনও অসম্পূর্ণ। SSLV-এর দৌড়ে Adani-backed Alpha Design Technologies ছিল—এটা তথ্য। PSLV-এর আগের production bid-এও Adani-Alpha Design consortium ছিল—এটাও তথ্য। কিন্তু PSLV বা LVM3-এর নতুন technology transfer আদানি গোষ্ঠী পেয়ে গিয়েছে—এমন কোনও ঘোষণা এখনও নেই।
ফলে আসল খবরটা হয়তো ‘আদানি রকেট বানাবেন’ নয়। আসল খবর হল, ISRO-র তৈরি PSLV ও LVM3-এর মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির বাণিজ্যিক দরজা এখন private industry-র জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে—আর সেই দরজায় আগে থেকেই উপস্থিত বড় নামগুলির মধ্যে আদানি-ঘনিষ্ঠ aerospace business-ও রয়েছে। এখন দেখার, শেষ পর্যন্ত এই দুই মহারকেটের প্রযুক্তি ও উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যায়, এবং ভারতের মহাকাশ অর্থনীতির নতুন মানচিত্রে কতটা জায়গা পায় কর্পোরেট ভারত।



