নজরবন্দি ব্যুরোঃ ২১ নির্বাচনে মধ্য হাওড়ায় তৃণমূলের গলার কাঁটা হতে পারে একটি ব্যাঙ্ক! কেন? সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে সারা বাংলায়। মুখ্যমন্ত্রী সমস্ত প্রকল্প শেষ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। হাওড়া শহরের রামকৃষ্ণপুর কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কের গ্রাহক ও কর্মচারীরা প্রতিটা নির্বাচনেই আশা করেন হয়তো তাদের দুর্দশার দিন শেষ হতে চলেছে। নির্বাচন হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা সমস্যাই থেকে যায়। তবুও দীর্ঘ ১০ বছর বন্ধ থাকা এই ব্যাঙ্কের গ্রাহক ও কর্মচারীরা মুখ্যমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তে একটু হলেও আশাবাদী।
আরও পড়ুনঃ বিহারে ভাষণের আগে, আচমকাই বাংলায় প্রধানমন্ত্রী!
বর্তমান রাজ্যসরকার ২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এলে প্রথম কাজ হবে রামকৃষ্ণপুর কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্ক খোলা। গ্রাহকদের সমস্যা মেটানো। এটা প্রত্যেকটি নির্বাচনী জনসভায় প্রচার করা হয়েছিলো।কিন্তু দুটো নির্বাচন মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। তাই এইবারেও আশা করলেও নিরাশা তাদের পিছু ছাড়ছে না। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা এটা ভাবতে বাধ্য করছে। রাজ্যের বিভিন্ন সমবায় ব্যাঙ্কের ATM পরিসেবা চালু হচ্ছে। উন্নতির চেষ্টা চলছে।
অনেক সমবায় ব্যাঙ্ককে অনুদান পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। সরকারি পরিষেবা সমবায় ব্যাঙ্কের মাধ্যমে করার চেষ্টা হচ্ছে।অথচ এই ব্যাঙ্কের বেলায় সরকারের কোনো ভূমিকা এখনও পর্যন্ত সেইভাবে দেখা যাচ্ছে না। যদিও মহামান্য উচ্চ আদালত এই ব্যাঙ্ক পুনর্জীবনের জন্য নির্দেশিকা জারী করেছে। আদালত ৩ জন সদস্যকে নিয়ে রিভাইভ্যাল & রিকভারী কমিটি গঠন করেছে। গ্রাহক, কর্মচারিদের অভিযোগ, এই ব্যাঙ্কের ৪০ হাজার গ্রাহক আর ৬০ জন কর্মচারীর মূল্য কি সরকারের কাছে নেই?
কমিটি মেম্বাররা ব্যাঙ্কে আসছেন এবং লোন আদায়ের কাজ করছেন। সূত্র বলছে এই ব্যাঙ্কের লোন আদায় অনেকটাই সম্ভব বলে উচ্চ আদালত নিযুক্ত কমিটির সদস্যরা মনে করেন। জানা গিয়েছে এই ব্যাঙ্কের অনেক সম্পত্তি আছে যেগুলো অবিলম্বে ক্রোক করা সম্ভব। সেখান থেকে একটা ভালো পরিমাণ অনাদায়ী ঋণের টাকা আদায় হবার সম্ভাবনা আছে বলে কমিটি সদস্যরা মনে করেন। সব জেনেও সরকার চুপ কেনো এই প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে গ্রাহক কর্মচারীদের মনে। পূর্বতন সরকার এই ব্যাঙ্কের পুনর্জীবনের জন্য প্রথমে অনুদান হিসাবে বেশ কয়েক কোটি টাকা দিয়েছিল। বর্তমান সরকার আনুমানিক ৭০ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে দিলে এই ব্যাঙ্ক খোলাটা কোনো অবাস্তব ঘটনা বলে মনে হয় না। সরকার এই টাকা দিলে ভবিষ্যতে ফেরত পাবার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করেন কর্মচারীরা।
৪০ হাজার গ্রাহক অনেক কষ্ট করে এই ব্যাঙ্কে টাকা জমা করেছিলেন। আজ তারা অসহায় হয়ে পড়েছে। ব্যাঙ্ক থেকে তারা প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে পারছে না। অনেক মানুষ তাঁর রিটায়ার্ডের সমস্ত টাকা এই ব্যাঙ্কে রেখেছিলেন অনেক ভরসা করে। কেউ কেউ মেয়ের বিয়ের টাকা, গয়না এখানে রেখেছিলেন। তাঁরা আজ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব।
কর্মচারীরা ব্যাঙ্ক বন্ধ হবার ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছে। পরিবার পরিজন নিয়ে তারা আজ পথে বসেছে। অন্যকিছুভাবে সংসার চালাতে হচ্ছে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাও বাধাপ্রাপ্ত। ২ জন কর্মচারী মারা গেছেন টাকার অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করতে না পেরে। সদ্য মারা গেলেন আর একজন। গ্রাহক কর্মচারীরা আশায় আশায় দিন গুনছেন এবার বোধহয় ব্যাঙ্ক খুলবে। গ্রাহকরা তাদের গচ্ছিত টাকা ফেরৎ পাবে এবং কর্মচারীরা তাদের চাকরি ফিরে পাবে। কিন্তু তাদের স্বপ্নের সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই হয়তো কেউ কেউ বুঝতে পেরেছেন। তাদের কাছে চোখের জলই একমাত্র সম্বল।
অথচ ব্যাঙ্কটি যখন খোলা ছিলো তখন ব্যাঙ্কটির ওপর মানুষের আস্থা জন্মেছিলো। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তকমা ছিলো। তাই মানুষের বিশ্বাস করতে অসুবিধা হচ্ছিলো না। জমার ওপর সুদও ভালো দেওয়া হতো। সবরকমের সুযোগসুবিধা পেতো গ্রাহকরা। কারণ এই ব্যাঙ্কের কর্মচারীরা গ্রাহকদের মনের মতো করে পরিষেবা দেবার চেষ্টা করতো। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ২০০৯ সালের ২৬শে আগষ্ট এই ব্যাঙ্কের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে। অভিযোগ আর্থিক তছরুপ। তারপর ১৭ই জুন ২০১০ তারিখ এই ব্যাঙ্কের লাইসেন্স বাতিল করে। বাধ্য হয়ে গ্রাহক আর কর্মচারীরা আদালতের দ্বারস্থ হয় সুবিচারের আশায়। রাজনৈতিক লড়াই বা ক্ষমতায় কে আসবে তা হয়তো সময় বলবে।
২১ নির্বাচনে মধ্য হাওড়ায় তৃণমূলের গলার কাঁটা হতে পারে একটি ব্যাঙ্ক! কেন? এই বন্ধ ব্যাঙ্ক ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বর্তমান শাসক দলের কাছে একটা বড়ো ভূমিকা হয়ে দাঁড়াবে। তার প্রমাণ গত লোকসভা নির্বাচনের মধ্যহাওড়ার ফলাফল। গত লোকসভা নির্বাচনে মধ্যহাওড়ায় শাসক দলের জেতার মার্জিন এতটাই কমে গেছিলো যেটা শাসক দলের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এই বন্ধ ব্যাঙ্ক খুললে শাসক দলের কাছে একটা সুখকর হবে বলে গ্রাহক এবং কর্মচারীরা মনে করেন। তাদের বক্তব্য, সবটাই নির্ভর কাছে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যসরকারের ওপর। তাই নতুন করে মনের আশার আলো জেগেছে গত ১০ বছর বন্ধ থাকা হাওড়া রামকৃষ্ণপুর কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কের ৪০ হাজার গ্রাহক ও ৬০ জন কর্মচারীর মনে। সময় বলবে কি ঘটতে চলেছে মধ্যহাওড়ায় আগামী কয়েক মাসের মধ্যে।



