রাফালের থেকেও বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি! জলের নীচে ‘ঘুমিয়ে’ শত্রুর ঘুম উড়াবে ভারতের ৬ সাবমেরিন

প্রজেক্ট ৭৫(আই)-এর অধীনে জার্মানির TKMS-এর সঙ্গে ছ’টি অত্যাধুনিক AIP সাবমেরিন তৈরির পথে ভারত। MDL-এ নির্মাণের পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও নৌ-শক্তি বাড়ানোই লক্ষ্য।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভারতীয় নৌবাহিনীর শক্তি বাড়াতে বড়সড় পদক্ষেপের পথে নয়াদিল্লি। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা প্রজেক্ট ৭৫(আই) (Project 75I)-এর অধীনে জার্মানির প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় ছ’টি অত্যাধুনিক প্রচলিত সাবমেরিন তৈরির চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়েছে অনেকটাই। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রকল্পটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭০,০০০ কোটি টাকা থেকে ৯০,০০০ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

এই প্রকল্পে ভারতের হয়ে প্রধান নির্মাতা হবে মাজাগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড (Mazagon Dock Shipbuilders Limited বা MDL)। জার্মানির থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস (Thyssenkrupp Marine Systems বা TKMS) প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত থাকবে। ২০২৫ সালেই MDL ও TKMS আনুষ্ঠানিক চুক্তি-আলোচনায় প্রবেশ করেছিল। লক্ষ্য শুধু বিদেশি প্রযুক্তি এনে সাবমেরিন তৈরি নয়, ভারতের মাটিতেই নির্মাণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো।

- Advertisement -

প্রজেক্ট ৭৫(আই)-এর ইতিহাস অবশ্য বেশ দীর্ঘ। ২০২১ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ছ’টি AIP-সজ্জিত প্রচলিত সাবমেরিন তৈরির জন্য RFP জারি করেছিল। তখন প্রকল্পটির আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছিল ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। পরবর্তী সময়ে মূল্য, প্রযুক্তি এবং বাণিজ্যিক শর্ত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলায় প্রকল্পটি বারবার পিছিয়েছে।

এ বার সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রযুক্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত বিষয়গুলি চূড়ান্ত করার পর প্রস্তাবটি ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি (Cabinet Committee on Security বা CCS)-র অনুমোদনের দিকে এগোচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে প্রথম সাবমেরিন তৈরির পর তা ভারতীয় নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হতে কয়েক বছর সময় লাগবে।

এই সাবমেরিনগুলির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হতে চলেছে এয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রোপালশন (Air Independent Propulsion বা AIP) প্রযুক্তি। সাধারণ ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনের তুলনায় AIP ব্যবস্থায় দীর্ঘ সময় জলের নীচে থেকে কাজ করা সম্ভব। ফলে শত্রুর নজর এড়িয়ে অনেক বেশি সময় গোপনে অবস্থান করা এবং নজরদারি চালানোর ক্ষমতা বাড়বে।

সহজ ভাষায় বললে, এই সাবমেরিনগুলির অন্যতম শক্তি হল তাদের ‘নীরব উপস্থিতি’। সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থেকে দীর্ঘ সময় টহল দিতে পারলে শত্রুর জাহাজ, সাবমেরিন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক গতিবিধির উপর নজর রাখা সহজ হবে। প্রয়োজনের সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী অস্ত্র ব্যবহার করার সক্ষমতাও থাকবে। তবে নির্দিষ্ট অস্ত্রের সম্পূর্ণ তালিকা চূড়ান্ত চুক্তি ও নকশার উপর নির্ভর করবে।

- Advertisement -

প্রজেক্ট ৭৫(আই)-এর নকশায় আধুনিক সেন্সর, যুদ্ধ-ব্যবস্থা, টর্পেডো, মিসাইল এবং কাউন্টারমেজার প্রযুক্তির মতো অত্যাধুনিক সরঞ্জাম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ২০২১ সালের নথিতেও AIP-এর পাশাপাশি আধুনিক টর্পেডো, মিসাইল, সেন্সর এবং অত্যাধুনিক কাউন্টারমেজার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

এই প্রকল্পের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল Make in India। ছ’টি সাবমেরিনই ভারতে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ শুধু সাবমেরিন কেনা নয়, এর সঙ্গে ভারতের নিজস্ব জাহাজ নির্মাণ শিল্প, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং সাবমেরিন প্রযুক্তির দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে। TKMS-এর সঙ্গে MDL-এর অংশীদারিত্ব সেই বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ।

প্রকল্পটির গুরুত্ব আরও বাড়ছে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক পরিস্থিতির কারণে। চিনের নৌবাহিনীর সাবমেরিন সক্ষমতা ক্রমশ বাড়ছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সাবমেরিন বহরও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় জলের নীচে থেকে নজরদারি করতে পারা আধুনিক প্রচলিত সাবমেরিন ভারতের নৌ-কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রচলিত সাবমেরিন বহরের সংখ্যাও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের বিষয়। নতুন ছ’টি সাবমেরিন যুক্ত হলে শুধু সংখ্যাই বাড়বে না, পুরনো প্ল্যাটফর্মের তুলনায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও অনেকটা উন্নত হবে। পাশাপাশি দেশীয় ভাবে সাবমেরিন নির্মাণের অভিজ্ঞতা বাড়ার ফলে ভবিষ্যতের আরও বড় প্রকল্পের ভিত্তিও শক্ত হতে পারে।

তবে এই প্রকল্পকে এখনও ‘চুক্তি হয়ে গিয়েছে’ বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ চূড়ান্ত অনুমোদন, বাণিজ্যিক শর্ত এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়গুলি সম্পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। প্রকল্পের আনুমানিক মূল্য নিয়েও বিভিন্ন রিপোর্টে ৭০ হাজার কোটি থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকার মতো ভিন্ন অঙ্ক উঠে এসেছে। ফলে চূড়ান্ত চুক্তির মূল্যই শেষ কথা হবে।

রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তির সঙ্গে সরাসরি তুলনা করলে প্রকল্প দুটির চরিত্র আলাদা হলেও প্রজেক্ট ৭৫(আই)-এর আর্থিক পরিমাণ নিঃসন্দেহে বিশাল। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, এটি শুধু ছ’টি সাবমেরিন হাতে পাওয়ার প্রকল্প নয়—ভারতের ভবিষ্যৎ সাবমেরিন নির্মাণ সক্ষমতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সমুদ্রপথে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত শক্তি বাড়ানোর একটি বড় পরীক্ষা। চুক্তি চূড়ান্ত হলে ভারতীয় নৌবাহিনীর ‘আন্ডারওয়াটার ওয়ারফেয়ার’ সক্ষমতায় নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর