সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার ঘাটতি মেটাতে বেসরকারি চিকিৎসক, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগেই কি সমাধান?

সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি মেটাতে বেসরকারি ক্ষেত্রের চিকিৎসকদের চুক্তিতে আনার উদ্যোগ রাজ্যের, কিন্তু স্থায়ী নিয়োগের বিকল্প এই ব্যবস্থা হতে পারে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি মেটাতে এবার বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রের চিকিৎসকদের চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগের পথে হাঁটতে চাইছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। জেলা ও মহকুমা হাসপাতালগুলিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিষেবা বাড়াতেই এই উদ্যোগ বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তবে স্থায়ী নিয়োগের বদলে চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় আদৌ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে চিকিৎসক মহলের একাংশের প্রশ্ন উঠছে।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের ‘প্রাইভেট প্র্যাকটিস’ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যভবনের সাম্প্রতিক নির্দেশিকাকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে এই পরিকল্পনা। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, সরকারি হাসপাতালে কোনও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রোগী ভর্তি হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বেসরকারি চেম্বারে রোগী দেখতে পারবেন না।

এই নিয়ম নিয়ে চিকিৎসকদের একাংশের আপত্তি মূলত ‘অ্যাডমিশন ডে’ ঘিরে। কোনও চিকিৎসক সপ্তাহে দু’দিন অ্যাডমিশন ডে-তে দায়িত্বে থাকলে, প্রতিবারের সঙ্গে ৭২ ঘণ্টার বিধিনিষেধ যুক্ত হওয়ায় সপ্তাহের বড় অংশেই তাঁর প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ থাকার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্যভবনের নতুন উদ্যোগকে সেই পরিস্থিতিরই একটি বিকল্প সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, জেলা ও মহকুমা স্তরে যে সমস্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁদের চুক্তির ভিত্তিতে সরকারি হাসপাতালে আনার পরিকল্পনা হয়েছে। এ জন্য চুক্তিপত্রের খসড়াও তৈরি হয়ে গিয়েছে। মঙ্গলবার বৈঠকে চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসকদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

শারদ্বতের দাবি, খুব শীঘ্রই এমন পরিস্থিতি তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে যাতে কোনও সরকারি চিকিৎসককে সপ্তাহে দু’দিন করে অ্যাডমিশন ডে নিতে না হয়। তাঁর বক্তব্য, জেলার বহু স্থানীয় চিকিৎসক এবং কলকাতার কর্পোরেট হাসপাতালের এমন চিকিৎসক রয়েছেন, যাঁদের বাড়ি সংশ্লিষ্ট জেলাতেই। তাঁদের স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে নির্দিষ্ট কয়েক দিনের পরিষেবায় যুক্ত করা যেতে পারে।

পরিকল্পনাটি কী ভাবে কাজ করবে, তার একটি মডেলও ব্যাখ্যা করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কলকাতার কোনও বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক যে দিন নিজের জেলার বাড়িতে যাবেন, সেই দিন এবং পরবর্তী দু’দিন বাড়ির কাছাকাছি সরকারি হাসপাতালে পরিষেবা দিতে পারেন। ওই তিন দিনের জন্য তাঁকে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে এবং সেই সময় প্রাইভেট প্র্যাকটিস করা যাবে না।

তবে এই মডেল নিয়েই আপত্তি তুলেছে চিকিৎসক সংগঠনগুলির একাংশ। অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের সাধারণ সম্পাদক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন, সরকারি হাসপাতালের পূর্ণ সময়ের চিকিৎসকের দায়িত্ব ও চুক্তিভিত্তিক বেসরকারি চিকিৎসকের দায়িত্বকে একই মানদণ্ডে দেখা যায় কি না। তাঁর দাবি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নয়, সরকারি হাসপাতালের শূন্যপদে পূর্ণ সময়ের চিকিৎসক নিয়োগই স্থায়ী সমাধান।

সার্ভিস ডক্টর্স ফোরামের সম্পাদক সজল বিশ্বাসও প্রশ্ন তুলেছেন, প্রতি বছর রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজগুলি থেকে এমডি, এমএস পাশ করা চিকিৎসকদের নিয়োগ না করে কর্পোরেট হাসপাতালের ব্যস্ত চিকিৎসকদের দিয়ে কী ভাবে নিয়মিত সরকারি পরিষেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তাঁর মতে, মাসে সীমিত কয়েক দিন কোনও চিকিৎসকের জেলা হাসপাতালে যাওয়া পূর্ণ সময়ের সরকারি পরিষেবার বিকল্প হতে পারে না।

রাজ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে বলে স্বাস্থ্যভবন যে বিষয়টি স্বীকার করছে, তার ইঙ্গিত মিলেছে মন্ত্রীর বক্তব্যেও। অ্যানাস্থেসিয়া, রেডিয়ো ডায়াগনসিস, চর্মরোগ, মনোরোগ, কার্ডিয়োলজি, নেফ্রোলজি, নিউরো মেডিসিন এবং নিউরো সার্জারির মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে চিকিৎসকের ঘাটতির কথা জানিয়েছেন তিনি।

স্বাস্থ্য দফতরের যুক্তি, হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে স্থায়ী নিয়োগ সম্পন্ন করতে সময় লাগে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরিষেবায় আনা সম্ভব হবে। বিশেষ করে জেলা ও মহকুমা স্তরে যেখানে পরিষেবার ঘাটতি বেশি, সেখানে দ্রুত চিকিৎসক পৌঁছে দেওয়াই এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।

চিকিৎসকদের একটি অংশ অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে শূন্যপদ পূরণের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের বক্তব্য, রাজ্যে নতুন মেডিক্যাল কলেজ, সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরিকাঠামো তৈরি হলেও সেই অনুপাতে চিকিৎসক নিয়োগ না হলে পরিকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব নয়।

এই প্রসঙ্গে বিরোধীদের পুরনো প্রশ্নও ফের সামনে এসেছে। বিরোধী আসনে থাকার সময় বিজেপি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে তৃণমূল সরকারকে নিশানা করেছিল। নন্দীগ্রামে আহত হওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলকাতায় এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদেশে চোখের চিকিৎসার প্রসঙ্গ তুলে সেই সময় প্রশ্ন তোলা হয়েছিল সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে। এখন চিকিৎসক সংগঠনগুলির একাংশই সেই পুরনো বিতর্ককে নতুন প্রেক্ষাপটে সামনে আনছে।

অন্যদিকে, রাজ্যের উদ্যোগকে পুরোপুরি খারিজও করছেন না চিকিৎসক মহলের সবাই। পশ্চিমবঙ্গ ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকী মনে করেন, কার্ডিয়োলজি, নিউরোসার্জারি, কার্ডিওথোরাসিক ও স্পাইন সার্জারি, গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি এবং অঙ্কো-সার্জারির মতো জটিল চিকিৎসায় বেসরকারি ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের দক্ষতা সরকারি হাসপাতালে পৌঁছলে তা সাধারণ মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে।

তবে তিনিও স্বীকার করেছেন, চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসক নিয়োগ স্থায়ী নিয়োগের বিকল্প নয়। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে থাকা সমস্ত শূন্যপদ দ্রুত চিহ্নিত করে চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ, সুপার স্পেশালিস্ট এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা জরুরি।

ফলে আপাতত সরকারের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তাৎক্ষণিক ঘাটতি মেটাতে দ্রুত কোনও কার্যকর ব্যবস্থা করা; অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদে সরকারি হাসপাতালের স্থায়ী শূন্যপদ পূরণ করা। চুক্তিভিত্তিক বেসরকারি চিকিৎসক দিয়ে সাময়িক চাপ কমানো সম্ভব হলেও সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্থায়ী চিকিৎসক-সংকটের সমাধান শেষ পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ার উপরই নির্ভর করবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন