সাদা সুতির শাড়ি, হাওয়াই চপ্পল আর শান্তিনিকেতনী ব্যাগ—দীর্ঘদিন ধরেই এই সাদামাটা সাজই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) পরিচয়ের অংশ। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর রূপচর্চা নিয়ে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল, তা কি আদৌ সত্যি? দাবি ছিল, কসমেটোলজিস্ট কেয়া শেঠ (Keya Seth) নাকি ৮-১০ জনের দল নিয়ে নিয়মিত কালীঘাটের বাড়িতে যেতেন। এবার সেই বহুচর্চিত দাবি সরাসরি নস্যাৎ করলেন কেয়া নিজেই।
২০১১ সালে প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেন মমতা। তার আগেই একটি সংবাদমাধ্যমের তরফে কেয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে নিজেদের ত্বক ও রূপচর্চার যত্ন নিতে পারেন, সেই বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। কেয়ার দাবি, সেই সাধারণ পরামর্শকেই পরে অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়।
কেয়ার কথায়, সেখান থেকেই তৈরি হয় গুঞ্জন—হবু মুখ্যমন্ত্রী নাকি তাঁর কাছেই রূপচর্চা করান। সময়ের সঙ্গে সেই গল্প আরও ছড়িয়ে পড়ে। একসময় তাঁকেই মমতার ‘মেকআপ আর্টিস্ট’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন কেয়া। তাঁর সাফ কথা, পুরো বিষয়টিই ভিত্তিহীন।
সম্প্রতি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ফলাফল নিয়েও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। ফলপ্রকাশের পর মমতাকে কালীঘাটের বাড়িতে দলীয় বৈঠক করতে এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা গিয়েছে। তাঁর মুখে-মুখে পরাজয়ের ধাক্কার ছাপ স্পষ্ট বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি। এর পরেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছিল, মানসিক চাপের কারণে কি তিনি রূপচর্চা বন্ধ করে দিয়েছেন?
এই প্রশ্ন শুনেই হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন কেয়া। তাঁর দাবি, মমতার সঙ্গে তাঁর কোনও ব্যক্তিগত বা পেশাগত সম্পর্কই নেই। এমনকি তিনি কখনও তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে মঞ্চে ছিলেন না, তাঁর হয়ে কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও অংশ নেননি বলেও স্পষ্ট করেছেন।
কেয়া আরও জানিয়েছেন, তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক না থাকায় রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে তাঁর অবস্থান বদলের প্রশ্নও ওঠে না। তাঁর বক্তব্য, মমতার সঙ্গে আগে তাঁর কোনও রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল না, এখনও নেই। ফলে তৃণমূল নেত্রীর পরাজয়ের পর তিনি অন্য কোনও রাজনৈতিক শিবিরে চলে যাচ্ছেন—এমন ধারণাও ঠিক নয়।
বরং তৃণমূল সরকারের আমলে নিজের কিছু সমস্যার কথাও তুলে ধরেছেন কেয়া। তাঁর দাবি, কালীঘাটের একটি মলের সামনে ডাস্টবিন তৈরির বিষয় থেকে শুরু করে বারুইপুরে অতিরিক্ত বিদ্যুতের প্রয়োজন এবং সিঙ্গুরে একটি প্রকল্প আটকে থাকা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁকে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁর যুক্তি, মমতার সঙ্গে যদি তাঁর এত ঘনিষ্ঠতা থাকত, তা হলে এই সমস্যাগুলি সমাধানে তাঁকে এতটা ভুগতে হত না।
তবে মমতার চেহারায় রাজনৈতিক পরাজয়ের প্রভাব পড়েছে কি না, সেই প্রশ্নে কিছুটা ভিন্ন মত দিয়েছেন কেয়া। তাঁর মতে, মানসিক চাপের ছাপ মানুষের চেহারায় পড়তেই পারে। দীর্ঘদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পর বড় ধরনের ধাক্কা এলে তার প্রভাব শারীরিক ভাবেও প্রকাশ পেতে পারে।
একই সঙ্গে রূপচর্চাকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় বলেই মনে করেন কেয়া। তাঁর মতে, কোনও সাধারণ মানুষ, মন্ত্রী কিংবা ভিআইপি নিজের সাজগোজ বা ত্বকের যত্ন নেবেন কি না, তা একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কেউ প্রকাশ্যে তা নিয়ে কথা না বললেও, ব্যক্তিগত ভাবে কিছু করলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলারও প্রয়োজন নেই।
এদিকে রাজ্যে নতুন সরকারের কাছে তাঁর প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন কেয়া। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) কাছে তাঁর আবেদন, বাংলায় ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হোক এবং ছোট শিল্পগুলিকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হোক। অর্থাৎ মমতার রূপচর্চা নিয়ে পুরনো গুজবের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি বাংলার শিল্প ও ব্যবসা নিয়েও নিজের প্রত্যাশা স্পষ্ট করলেন কেয়া শেঠ।



