প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি রক্ষা, ‘আমার ভাই-বোনেরা বাঁচল, আমি এতেই খুশি’: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের ঐতিহাসিক রায়ে ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি রক্ষা; তদন্ত চলবে বলে জানাল আদালত।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

আমার ভাই-বোনেদের চাকরি বাঁচল, আমি এতেই খুশি—হাই কোর্টের রায়ের পর এমনটাই বললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ আজ ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি রক্ষার ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছে, যা রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন আলো জ্বালাল। এই রায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তৈরি হয়েছে প্রবল আলোড়ন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ পরিষ্কার জানিয়ে দেন, রাজ্যের সরকারের কাজ চাকরি দেওয়া, চাকরি খেয়ে নেওয়া নয়। তাঁর বক্তব্য, কথায় কথায় আদালতে গিয়ে চাকরি বাতিলের দাবি তোলা কোনওভাবে মানবিক নয়। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আদালত আজ যে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে, তা সমাজের স্বার্থেই জরুরি। তিনি দাবি করেন, ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি রক্ষা হওয়ায় হাজারো পরিবারের মুখে হাসি ফিরবে।

এই মামলার সূচনা বহু বছর আগেই। ২০১৪ সালের TET ভিত্তিক বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ৪২,৫০০-এর বেশি শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়োগে অনিয়ম, সংরক্ষণ নীতি লঙ্ঘন, অ্যাপটিটিউড টেস্ট না নেওয়া, সিলেকশন কমিটি গঠন না করা এবং যোগ্যতাহীন প্রার্থী নিয়োগের অভিযোগ ওঠে। মামলাকারীদের দাবি ছিল, ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছিল এবং পুরো প্রক্রিয়াই পুনরায় শুরু করা উচিত।

প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি রক্ষা, ‘আমার ভাই-বোনেরা বাঁচল, আমি এতেই খুশি’: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি রক্ষা, 'আমার ভাই-বোনেরা বাঁচল, আমি এতেই খুশি': মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি রক্ষা, ‘আমার ভাই-বোনেরা বাঁচল, আমি এতেই খুশি’: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

গত বছর বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সিঙ্গল বেঞ্চ রায়ে প্রশিক্ষণহীন ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল করে তাদের পার্শ্বশিক্ষক হিসেবে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই রায়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার পরিবারে। কারণ দীর্ঘ নয় বছর ধরে স্কুলে কাজ করার পর চাকরি হারানোর ভয় ছোট বিষয় নয়।

আজ সেই আতঙ্ক অনেকটাই কাটল। বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, শিক্ষকদের চাকরি বহাল থাকবে, তবে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত চলবে। অর্থাৎ চাকরি রক্ষা পেলেও আইনি প্রক্রিয়া থেকেই যাচ্ছে। আদালত কোনওভাবেই ভুলের দায়কে আড়াল করতে নারাজ।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের রায়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। একদিকে প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি রক্ষা, অন্যদিকে দুর্নীতি তদন্তের প্রক্রিয়া চালু থাকা—দুটোকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বেঞ্চ মনে করেছে, দীর্ঘ বছর ধরে কাজ করা এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে হঠাৎ চাকরি হারাতে হলে সামাজিক অশান্তি বাড়ত, বহু পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ে পড়ত। মানবিক দিকটি তাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

রাজ্য সরকার ও প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ বারবার দাবি জানিয়েছে, নিয়োগে কোনও কংক্রিট দুর্নীতির প্রমাণ নেই। অনেক ভুল সংশোধনও করা হয়েছে। আদালত তাদেরই যুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তবে আদালত এও বলেছে, তদন্ত চলবে, সিবিআই বা অন্য সংস্থার কাজ বন্ধ হবে না।

এর ফলে রাজ্যের শিক্ষা প্রশাসনে আপাত স্থিতিশীলতা ফিরলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ২০১৬ সালের SSC নিয়োগ মামলা, তার পরবর্তী আইনি মারপ্যাঁচ, আর এবার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ মামলা—এই সব মিলিয়ে রাজ্যের নিয়োগ প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা নড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন প্রয়োজন শতভাগ স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা এবং কঠোর গাইডলাইন মেনে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া চালানো।

আজকের রায়ের পর স্পষ্ট—চাকরি রক্ষা পেলেও প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের সামনে বড় দায়িত্ব। ভবিষ্যতে আর কোনও ধরনের গাফিলতি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। আদালত কার্যত বলে দিয়েছে, মানবিকতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশাসনের দায়বদ্ধতাও সমান জরুরি।

মোট কথা, ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি রক্ষা রাজ্যে বহু পরিবারের মুখে স্বস্তি এনে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথাতে সেই আনন্দের প্রতিফলনও দেখা গেল। শিক্ষা দপ্তরের জন্যও এটি এক বড় পরীক্ষার মুহূর্ত। এখন দেখতে হবে ভবিষ্যতের নিয়োগ কতটা স্বচ্ছ হয় এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে কতটা সক্ষম হয় রাজ্য।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত