কলকাতা: শ্রাবণ মাস মানেই শিবের মাস। সোমবারের উপবাস, শিবলিঙ্গে জল ঢালা, মন্দিরে যাওয়া— এই নিয়মকানুনে ডুবে থাকেন ভক্তরা। কিন্তু মহিলাদের মনে একটা প্রশ্ন সবসময়ই ঘুরতে থাকে— পিরিয়ড চলাকালীন শ্রাবণ মাসের পুজো করা যাবে কি? শিবলিঙ্গে জল ঢালা যাবে? উপবাস করা যাবে? মন্দিরে যাওয়া যাবে? এই প্রশ্নগুলো নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন অনেকেই। জেনে নিন, শাস্ত্র কী বলে, আর আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই বা কী ভাবে এই সময়টায় পুজো করা উচিত।
শাস্ত্র কী বলে?
হিন্দু শাস্ত্র মতে, ঋতুমতী নারীর শরীর এই সময়ে শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। তাই মন্দিরে যাওয়া বা পুজোর আসনে বসা নিষেধ। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ঈশ্বর থেকে দূরে থাকতে হবে। শাস্ত্রে ‘মানসিক পুজো’র কথাও বলা আছে— অর্থাৎ মন দিয়ে ভগবানকে স্মরণ করা। শ্রাবণ মাসে শিবের ধ্যান, মন্ত্র জপ আর মানসিক পুজো করলে সমান পুণ্যলাভ হয় বলেই জানাচ্ছেন পুরোহিতরা।
পিরিয়ড চলাকালীন কী কী করতে পারেন?
১. মানসিক পুজো করুন: সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মানসিক পুজো। চোখ বন্ধ করে শিবলিঙ্গের ধ্যান করুন। মনে মনে বেলপাতা, ফুল, জল নিবেদন করুন। শাস্ত্র মতে, ভক্তি দিয়েই মহাদেবকে পাওয়া যায়— শারীরিক উপস্থিতি জরুরি নয়।
২. মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করুন: পিরিয়ড চলাকালীন মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও শুভ। বিছানায় শুয়ে বা বসে মালা জপ করতে পারেন। এতে শিবের কৃপা তো পাবেনই, মানসিক শান্তিও পাবেন। মন্ত্রটি— “ওঁ ত্র্যম্বকম্ যজামহে সুগন্ধিম্ পুষ্টিবর্ধনম্। উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যোর্মুক্ষীয় মামৃতাৎ॥”
৩. ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ জপ করুন: পিরিয়ডের সময় শিবের মূল মন্ত্র ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ জপ করতে কোনও বাধা নেই। রাতে ঘুমানোর আগে ১০৮ বার এই মন্ত্র জপ করুন। এতে শরীর ও মন দুই-ই শান্ত থাকবে। শ্রাবণ সোমবারের ১০টি টোটকা জানতে এখানে পড়ুন।
৪. শিবের গান বা ভজন শুনুন: ইউটিউব বা স্পটিফাইতে শিবের ভজন, শিব তাণ্ডব স্তোত্রম বা রুদ্রম চমকম শুনতে পারেন। এতে মন শান্ত হবে আর শিবের প্রতি ভক্তিও বজায় থাকবে।
৫. উপবাসের নিয়মে রদবদল করুন: পিরিয়ড চলাকালীন শরীর দুর্বল থাকে। তাই কঠোর উপবাস না করে হালকা নিরামিষ খাবার খান। ফল, দুধ, সাবু খেতে পারেন। উপবাসের থেকে শরীরের যত্ন নেওয়া এই সময়ে বেশি জরুরি। শ্রাবণ সোমবার ব্রতের সম্পূর্ণ নিয়ম জানতে এখানে পড়ুন।
যে ৩টি কাজ একেবারেই করবেন না:
১. শিবলিঙ্গে জল ঢালবেন না: পিরিয়ড চলাকালীন শিবলিঙ্গ স্পর্শ করা বা জল ঢালা শাস্ত্র মতে নিষেধ। তাই বাড়ির কাউকে দিয়ে জল ঢালিয়ে নিন, অথবা মানসিক পুজোই সারুন।
২. মন্দিরে যাবেন না: এই সময়ে মন্দিরে না যাওয়াই ভালো। শাস্ত্র মতে, ঋতুমতী অবস্থায় মন্দিরে প্রবেশ নিষেধ। তবে মনে রাখবেন, এটা অশুদ্ধতার জন্য নয়— বরং শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্যই এই নিয়ম।
৩. উপবাস করে শরীরকে কষ্ট দেবেন না: পিরিয়ডের সময় শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হয়, তাই এই সময় কঠোর উপবাস করা উচিত নয়। শরীর সুস্থ রাখাই আসল পুজো।
আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি কী বলে?
অনেক আধুনিক নারীই মনে করেন, পিরিয়ড কোনও অশুদ্ধি নয়— এটা শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাই তাঁরা এই সময়েও পুজো করেন। তবে পুরোহিতদের মতে, এটা অশুদ্ধির প্রশ্ন নয়, বরং শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার প্রশ্ন। পিরিয়ডের সময় শরীর দুর্বল থাকে, তাই বেশি পরিশ্রম না করাই ভালো। তাই বাড়িতে বসে মানসিক পুজোই সবচেয়ে ভালো উপায়। শ্রাবণের তৃতীয় সোমবার রুদ্রাক্ষ ধারণের নিয়ম জানতে এখানে পড়ুন।
মনে রাখবেন, ভক্তি দিয়েই ভগবানকে পাওয়া যায়। পিরিয়ড চলাকালীন শরীরকে কষ্ট দিয়ে উপবাস করা বা জোর করে মন্দিরে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং এই সময়টায় মানসিক পুজো, মন্ত্র জপ আর শিবের ধ্যান করুন। মহাদেব তো ভোলানাথ— তিনি ভক্তের মন দেখেন, শরীর নয়।