নেপালে হড়পা বানের ক্ষত গভীর, শিবিরে বেবিফুড নেই! মদ-বিড়ির গন্ধে মেঝেতেই দিন কাটছে মায়েদের

হড়পা বানের ১১ দিন পরেও স্বাভাবিক হয়নি নেপাল। ত্রাণশিবিরে শিশুদের জন্য বেবিফুড নেই, স্তন্যপান করানোর জায়গা নেই, বিপদে অন্তঃসত্ত্বারাও; সামনে আরও হিমবাহ-হ্রদের ঝুঁকি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: নেপালের হড়পা বানের ভয়াবহতা শুধু ধ্বংসস্তূপে আটকে নেই, তার ছাপ এখন স্পষ্ট ত্রাণশিবিরেও। কোলের শিশু নিয়ে গাদাগাদি শিবিরে রাত কাটাচ্ছেন মায়েরা, অথচ মিলছে না বেবিফুড। বড়দের জন্য বরাদ্দ ডাল-ভাতই খাওয়াতে হচ্ছে শিশুদের। কোথাও আবার স্তন্যপান করানোর মতো নিরিবিলি জায়গাটুকুও নেই।

উত্তর ও মধ্য নেপালে ২৬ অগস্টের হড়পা বান ও ভূমিধসের পর বহু মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন ত্রাণশিবিরে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সদ্যোজাতের মা, ছোট শিশুর মা এবং অন্তঃসত্ত্বা মহিলারাও। দিনের খাবার জুটলেও শিশুদের জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন তাঁরাই।

শর্মিলা শ্রেষ্ঠার অভিজ্ঞতাই সেই ছবিটা স্পষ্ট করে দেয়। ১৪ মাসের মেয়েকে হড়পা বানে হারিয়ে ছ’ঘণ্টা পাহাড় পেরিয়ে খুঁজেছিলেন তিনি। দু’-তিন দিন পর সন্তানকে ফিরে পেলেও আগের জীবন আর ফেরেনি। এখন দক্ষিণ-পশ্চিম কাঠমান্ডুর একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়ে মেঝেতেই রাত কাটছে তাঁর।

শর্মিলার সঙ্গে রয়েছেন তাঁর ননদও, কোলে ১৮ মাসের সন্তান। দু’জনেরই অভিযোগ, শিবিরে শিশুদের জন্য আলাদা খাবার নেই। ফলে নিজেদের পাতে যে ডাল-ভাত জুটছে, সেখান থেকেই সামান্য করে তুলে দিতে হচ্ছে একরত্তিদের মুখে। তাঁদের এখন একটাই চাওয়া—শিশুদের নিয়ে থাকার মতো পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ জায়গা।

সমস্যা শুধু খাবারে আটকে নেই। ভিড়ে ঠাসা শিবিরে রয়েছেন অন্তঃসত্ত্বারাও। আচমকা প্রসবযন্ত্রণা শুরু হলে কোথায় যাবেন, চিকিৎসক পাবেন কি না—সেই আতঙ্ক তাড়া করছে তাঁদের। কারণ বহু জায়গাতেই বানের জেরে হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভোটেকোশী-ত্রিশূলী করিডোরের কাছে একটি শিবিরে তিন মাসের শিশুকে নিয়ে রয়েছেন পারিয়ার নামে এক তরুণী। তাঁর অভিযোগ, শিশুকে স্তন্যপান করানোর মতো আলাদা জায়গা নেই। চারপাশে অপরিচিত মানুষের ভিড়, তার মধ্যেই কেউ ধূমপান করছেন, কেউ মদ্যপান করছেন।

পারিয়ারের কথায়, সিগারেট ও মদের গন্ধে তাঁর শিশুটি ঠিকমতো ঘুমোতেও পারছে না। সময়মতো খাবার না পাওয়ায় শিশুকে স্তন্যপান করাতেও সমস্যা হচ্ছে। এমনকি গত সপ্তাহে শিশুটির টিকাও দেওয়া সম্ভব হয়নি। ছোট শিশুর মা এবং অন্তঃসত্ত্বাদের জন্য আলাদা শিবিরের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

হড়পা বানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধড়িং। রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাব অনুযায়ী, এই তিন জেলার ১৫টি পুরসভা এলাকায় অন্তঃসত্ত্বার সংখ্যা ৪,৪৩০। চলতি মাসেই তাঁদের মধ্যে ৪৯২ জনের সন্তান প্রসবের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ যত্ন প্রয়োজন ৭৪ জনের।

ত্রিশূলী হাসপাতালের মাতৃ বিভাগের প্রধান বাসন্তী পাঞ্চার মতে, বিপর্যয়ের পর বহু অন্তঃসত্ত্বার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। কেউ কেউ মানসিক অবসাদেও ভুগছেন। তার প্রভাব প্রসব এবং সদ্যোজাতের স্বাস্থ্যের উপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

সমস্যা আরও বাড়িয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। আগে ত্রিশূলী থেকে কাঠমান্ডু যেতে সময় লাগত প্রায় দু’ঘণ্টা। কিন্তু হড়পা বানে রাস্তা ভেঙে যাওয়ার পর এখন সেই পথ পেরোতে কতটা সময় লাগবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। হাসপাতালে সদ্যোজাতদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা পরিষেবা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

এর মধ্যেই নেপাল জানিয়েছে, রবিবার পর্যন্ত ১,৩৪২টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ৮৫টি শিশু রয়েছে। এখনও নিখোঁজ ৪,৯৯৬ জন। উদ্ধার করা হয়েছে ১৩,১০০ জনকে। বিপর্যয়ের ১১ দিন পরেও কাদামাটির স্তূপ থেকে দেহ উদ্ধার হচ্ছে, যার অনেকগুলিই শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

উদ্ধার হওয়া দেহের মধ্যে প্রায় ৫০০টির কোনও না কোনও দেহাংশ নেই বলে জানানো হয়েছে। নেপাল বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী জানিয়েছে, ৯৮ জনের দেহ শনাক্ত করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। আরও ১,০০০ জনের দেহ থেকে DNA নমুনা সংগ্রহের পর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছে।

বিপর্যয়ের আশঙ্কা অবশ্য এখানেই শেষ নয়। পাহাড়ের খাঁজে তৈরি হওয়া চারটি হ্রদের জল কমানোর কাজ শুরু করেছে নেপাল। কিন্তু আরও ১৭টি হিমবাহ-হ্রদকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলি ফেটে গেলে ফের ভয়াবহ হড়পা বান নামতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞেরা।

২০২০ সালে International Centre for Integrated Mountain Development (ICIMOD) এবং United Nations Development Programme (UNDP)-এর যৌথ রিপোর্টে হিমালয়ের ৪৭টি হ্রদকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তালিকায় নেপালের ২১টি, তিব্বতের ২৫টি এবং ভারতের একটি হ্রদ রয়েছে।

তবে ধ্বংস আর মৃত্যুর এই দীর্ঘ তালিকার মধ্যেও উদ্ধার অভিযানে এসেছে আশার খবর। পর পর দু’দিনে চার জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গ থেকে শুক্রবার নয় দিন পর উদ্ধার হন দুই নেপালি শ্রমিক। শনিবার ত্রিশূলী নদীর উপর আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ২২৫ মিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ থেকে ১০ দিন পর উদ্ধার করা হয় এক চিনা নাগরিককে।

সেই দিনই নুয়াকোট জেলার বিদুরে একটি চারতলা বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকেও এক প্রৌঢ়াকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানে পর পর এই চারটি সাফল্য নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে। কিন্তু ত্রাণশিবিরে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বাদের দুর্দশা এবং সামনে থাকা নতুন হিমবাহ-হ্রদের ঝুঁকি মনে করিয়ে দিচ্ছে, নেপালের বিপর্যয় এখনও শেষ হয়নি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন