পদ্মশ্রী মঙ্গলাকান্ত রায় আর নেই। উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটল তাঁর প্রয়াণে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়িতে নিজের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কিংবদন্তি সারেঙ্গি শিল্পী। বয়স হয়েছিল ১০৪ বছর। তাঁর মৃত্যুতে তিস্তাপাড় জুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
লোকসঙ্গীতপ্রেমী থেকে সংস্কৃতি মহল— সকলের কাছেই মঙ্গলাকান্ত রায় ছিলেন এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ের পর তাঁর জীবনাবসান উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বলেই মনে করছেন অনেকে।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই কর্কটরোগে ভুগছিলেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। গত কয়েক মাসে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। চিকিৎসার জন্য তাঁকে জলপাইগুড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসাও চলছিল।
চিকিৎসার পর সাময়িক উন্নতির আশা দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত শরীর আর সাড়া দেয়নি। পরিবারের সদস্যদের দাবি, সম্প্রতি তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার রাত দেড়টা নাগাদ ময়নাগুড়ির বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
শুক্রবার ধওলাগুড়িতে সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য। শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে ভিড় জমান বহু সংস্কৃতিপ্রেমী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং তাঁর অনুরাগীরা।
জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি ব্লকের ধওলাগুড়ির বাসিন্দা মঙ্গলাকান্ত রায় প্রায় আট দশকেরও বেশি সময় ধরে সারেঙ্গির মাধ্যমে লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর পরিবেশনা ছিল একেবারেই অনন্য।
শুধু সারেঙ্গি বাজানো নয়, এই বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে তিনি অবিকল পশুপাখির ডাক এবং হরবোলা সুর তুলে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন। তাঁর এই অসাধারণ দক্ষতাই তাঁকে অন্য শিল্পীদের থেকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছিল।
জীবনের অধিকাংশ সময়ই আর্থিক অনটনের মধ্যে কাটলেও শিল্পচর্চা থেকে কখনও সরে আসেননি তিনি। গ্রামবাংলার লোকঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ে শেষ দিন পর্যন্ত নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন।
তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। সেই সম্মান পাওয়ার পরও তিনি একইভাবে মাটির কাছাকাছি থেকে লোকশিল্পের প্রচারে কাজ করে গিয়েছেন।
মঙ্গলাকান্ত রায়ের প্রয়াণ শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়, উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির এক মূল্যবান অধ্যায়ের সমাপ্তি। তবে তাঁর সারেঙ্গির সুর, লোকঐতিহ্যের প্রতি নিষ্ঠা এবং শিল্পের প্রতি অদম্য ভালোবাসা আগামী প্রজন্মের কাছে চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।



